আন্তর্জাতিক জাহাজে সার্টিফিকেট জালিয়াতি বেকার হয়ে পড়ছেন বাংলাদেশি নাবিকরা


আন্তর্জাতিক সমুদ্র জাহাজে ইঞ্জিনিয়ার, ক্যাপ্টেনসহ বিভিন্ন পদে বেশ ভালোভাবেই চাকরি করছিলেন বাংলাদেশিরা। কিন্তু বিধি বাম। সম্প্রতি এ সেক্টরেও কাজের সুযোগ পাচ্ছেন না অনেক যোগ্য বাংলাদেশি। কিছু অশিক্ষিত ও অদক্ষ বাংলাদেশিই এ জন্য দায়ী। তাদের অনেকেই ভুয়া সার্টিফিকেটে চাকরি করে ধরা পড়ছেন। কেউ কেউ ভিসা নিয়ে জাহাজে না ওঠে পালিয়ে যাচ্ছেন। এসব কারণে আন্তর্জাতিক এই শ্রমবাজার কর্মসংস্থান এখন হুমকির মুখে। জালিয়াতিকারী বাংলাদেশিদের জন্য চাকরি হারাতে হচ্ছে অভিজ্ঞদেরও। চাকরি পাচ্ছেন না মেরিন ইনস্টিটিউট (ক্যাডেট ও নন-ক্যাডেট) থেকে পাস করা অসংখ্য শিক্ষার্থী।

সূত্র জানায়, সনদ দেওয়ার দায়িত্ব সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের (ডিজি শিপিং)। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন এ সংস্থাটির সনদ প্রদানে অদক্ষতা ও অবহেলার সুযোগে এ অবস্থার তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ আসছে। এ বিষয়ে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের চিফ ইঞ্জিনিয়ার অ্যান্ড শিপ সার্ভেয়ার একেএম ফখরুল ইসলাম বলেন, পাস করা সব শিক্ষার্থীর কর্মসংস্থান হচ্ছে না। গত কয়েক বছর ধরে এ সংকট দেখা দিয়েছে। তবে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কাজের ক্ষেত্র তৈরির জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই।

জানা গেছে, বিভিন্ন দেশ থেকে তদন্তের জন্য পাঠানো সনদ যাচাই করে অনেক বাংলাদেশি নাবিকেরই ভুয়া সার্টিফিকেট পাওয়া গেছে। জাল ও ভুয়া সার্টিফিকেট ধরা পড়ার ঘটনায় জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক নৌ সংস্থার (আইএমও) তালিকায় শীর্ষ ৫ দেশের একটি বাংলাদেশ। অন্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ পানামা, মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইন। এর মধ্যে ফিলিপাইন কালো তালিকাভুক্ত হয়েছিল। দীর্ঘদিন পর তা থেকে বের হতে সক্ষম হয় দেশটি। এখন ওই তালিকায় বাংলাদেশের নাম স্থান পাওয়ার উপক্রম। অথচ বাংলাদেশ বর্তমানে আইএমও তালিকা অনুযায়ী ‘বি’ ক্যাটাগরির (মোটামুটি মানসম্পন্ন) দেশ।

সূত্র জানায়, সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের এক শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে ভুয়া আইডি ও সনদের মাধ্যমে জাহাজ পরিচালনার মতো চাকরিতে পাঠায় ম্যানিং এজেন্টগুলো। রিক্রুটিং এজেন্সির মতোই আন্তর্জাতিক জাহাজে কর্মসংস্থান তৈরির কাজ ম্যানিং এজেন্টের। মূলত সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর থেকে দেওয়া বেআইনি আইডি, নাবিকদের পরীক্ষায় অনিয়ম, ভুয়া ও জাল সার্টিফিকেট, বিদেশি জাহাজে যোগ না দিয়ে পালিয়ে যাওয়া এবং ম্যানিং এজেন্টদের অনিয়মসহ বিভিন্ন কারণে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলছে। এ সুযোগে বাজার দখল করছে প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য দেশগুলো।

নৌ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, মেরিন ইনস্টিটিউট ও রেটিং প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট থেকে পাস করা সব শিক্ষার্থীর কর্মসংস্থান হচ্ছে না। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জাহাজে তাদের চাকরি হয়ে থাকে। বিগত তিন বছর চাকরির ক্ষেত্র তৈরি না হওয়ায় এ খাতে বেকারত্বের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।

ডিজি শিপিংয়ের এক পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে, গত তিন বছরে বিভিন্ন মেরিটাইম ও রেটিং প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট থেকে ২ হাজার ৪৩৬ শিক্ষার্থী সনদ পান। এর মধ্যে কর্মসংস্থান হয়েছে ১ হাজার ১৫২ জনের। আর কর্মহীন ১ হাজার ৩০১ জন। বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি থেকে ৫৩৯ শিক্ষার্থী সনদ পেয়েছে। এর মধ্যে জাহাজে কর্মসংস্থান হয়েছে ২০২ জনের। এখনো বেকার ৩৩৭ জন। একইভাবে ১৮টি বেসরকারি মেরিটাইম ইনস্টিটিউট থেকে সনদ নিয়ে ৮৯৮ শিক্ষার্থীর মধ্যে কর্মসংস্থান হয় মাত্র ৪৩৫ জনের। এখানে বেকার ৪৬৩ জন। এ ছাড়া ন্যাশনাল মেরিটাইম ইনস্টিটিউট থেকে ৮৭২ জন পাস করে চাকরি পেয়েছেন মাত্র ৪২৪ জন। আর দুটি বেসরকারি মেরিটাইম ইনস্টিটিউট থেকে ১২৬ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৭৩ জনের কর্মসংস্থান হলেও ৫৩ জন এখনো বেকার।

সনদ জালিয়াতির মাধ্যমে জাহাজে চাকরি নেওয়ার অভিযোগে ইতোমধ্যে সিঙ্গাপুর, দুবাই, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশি নাবিকদের ভিসা দেওয়া প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। ভারতসহ কয়েকটি দেশও সহজে ভিসা দিচ্ছে না।

দেখা গেছে, তৃতীয় শ্রেণি পাস করা মোস্তফা কামাল ক্যাপ্টেন এবং এইচএসসি পাস করা মনিরুজ্জামান চিফ ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বসে আছেন। তাদের অদক্ষতায় কম্বোডিয়ার পতাকাবাহী ‘মিং গুয়ান’ নামক জাহাজ জাপান উপকূলে ডুবে যায়। ওই ঘটনায় মারা যান তিন ব্যক্তি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতিবাচক বার্তার এটি অন্যতম দৃষ্টান্ত। এ ধরনের ঘটনাগুলো প্রকাশ পাওয়ার পর বিভিন্ন সময়ে চিন, সিঙ্গাপুর, ইরানসহ বেশ কয়েকটি দেশ বাংলাদেশি নাবিকদের সনদ জালিয়াতির বিষয়টি নিয়ে আইএমওতে রিপোর্ট করেছে। এ ছাড়া বাংলাদেশি নাবিকদের বিরুদ্ধে আইএমওর নিয়মনীতি লঙ্ঘনের অভিযোগও ওঠছে।

সূত্র জানায়, দেশে প্রায় ১২ হাজার নিবন্ধিত অফিসার ও ক্রু রয়েছেন। তাদের মধ্যে গড়ে ৩-৪ হাজার ব্যক্তি বিভিন্ন দেশে কর্মরত। বাকিরা চাকরি পাচ্ছেন না। আন্তর্জাতিক নিয়মানুযায়ী একজন নাবিক বছরের ৯ মাস চাকরি করেন এবং ৩ মাস ছুটিতে থাকেন। এ হিসাবে গড়ে ৮ হাজার নাবিক সবসময় বিদেশি জাহাজে কর্মরত থাকার কথা। কিন্তু চাকরি মিলছে অর্ধেকের। বাকিরা বেকার। একজন মাস্টার ও চিফ ইঞ্জিনিয়ার মাসে গড়ে ৮ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা এবং ক্রু ২ থেকে ৩ লাখ টাকা বেতন পান।

নাবিকদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন বাংলাদেশ সি ফারার্স ইউনিয়ন সূত্র জানায়, জাহাজ থেকে পালিয়ে যাওয়া, ভুয়া সিডিসি ধরা পড়াসহ বিভিন্ন কারণে কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশি নাবিকদের কেউ নিতে চাইছে না।

ডিজি শিপিং বলছে, এখন সনদ পাওয়া শিক্ষার্থীদের ডেটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে এবং তাদের প্রশিক্ষণ ও চাকরিসংক্রান্ত তথ্য অনলাইনে মনিটরিংয়ের ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে। এতে করে জাল সনদের ব্যবহার বন্ধ হবে। এর বাইরেও জাল সনদ বন্ধে নাবিকদের সিডিসি ও যোগ্যতা সনদ (সিওসি) অনলাইনে যাচাই করাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং শিপ ম্যানিং এজেন্টদের কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। পাশাপাশি জাল সনদ ব্যবহারের সঙ্গে জড়িত শিপ ম্যানিং এজেন্টদের লাইসেন্স বাতিলেরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দেশীয় শিক্ষার্থীদের সনদের গ্রহণযোগ্যতা স্মারক স্বাক্ষরের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) সনদকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এ ছাড়া ইতালি, জার্মানি ও ইউকেসহ ২৫টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশি সনদের গ্রহণযোগ্যতা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে। আর দক্ষিণ কোরিয়া, ডেনমার্ক, পানামা, কম্বোডিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে সমঝোতা চলছে। এ ছাড়া ভিসা সমস্যা সমাধানে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
সূত্র : আামাদের সময়

Post a Comment