মাদকের ব্যাপারে জিরো টলারেন্সে বিজিবি


সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী ‘বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ’(বিজিবি) শুধু সীমান্ত সুরক্ষা, চোরাচালান প্রতিরোধ, নারী ও শিশু এবং মাদক পাচার প্রতিরোধ নয় অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজেও দায়িত্ব পালন করে থাকে। বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অবিস্মরণীয় বীরত্বপূর্ণ ভূমিকায় অংশগ্রহণকারী এ সীমান্ত বাহিনীটি গঠনের ইতিহাস বেশ পুরোনো।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী কর্তৃক ১৭৯৪ সালে গঠিত দফ্রন্টিয়ার প্রটেকশন ফোর্সদ এর নাম পরিবর্তন করে ১৭৯৫ সালের ২৯ জুন দরামগড় লোকাল ব্যাটালিয়নদ নামে এ বাহিনীর যাত্রা শুরু হয়। প্রতিষ্ঠাকালে ৪৪৮ জন সদস্যের দুদটি অনিয়মিত অশ্বারোহী দল ও চারটি কামান নিয়ে এর কার্যক্রম শুরু হয়েছিল।

২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি বাহিনীটির সদর দফতরে সংঘটিত বর্বরোচিত হত্যাকান্ডের পর বাহিনী পুনর্গঠনের প্রয়োজন হেতু ২০১০ সালের ২০ ডিসেম্বর দবর্ডার গার্ড বাংলাদেশ নামকরণ করা হয়।

বাহিনীটির বর্তমান মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ বিজিবিএম, পিবিজিএম, পিএসসি, জি।

সম্প্রতি  এক বিশেষ সাক্ষাতকারে নিজ বাহিনীর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলেছেন তিনি। বলেছেন মাদক চোরাচালান বন্ধে প্রতিবেশী মায়ানমার কোনো কার্যকরী পদক্ষেপই নিচ্ছে না। তাছাড়া দেশীয় অন্যান্য বাহিনীগুলোর মধ্যেও সমন্বয় ও সহযোগীতামূলক মানষিকতা নেই। তবুও বিজিবি আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। পাঠকদের উদ্দেশ্যে সাক্ষাতকারের চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো। আজ থাকছে এর শেষ পর্ব।

বাংলাদেশে মাদকের কোনো কারখানা নেই। কিন্তু তারপরও সীমান্ত পথে প্রতিদিনই বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য অবৈধভাবে দেশে ঢুকছে। এর জন্য মূলত বিজিবিকে দোষারোপ করা হয়। এ সম্পর্কে আপনার বক্তব্য জানতে চাই।

আজিজ আহমেদ : যারা মাদক চোরাচালানের জন্য শুধু বিজিবিকে দায়ী করেন তাদের উদ্দেশে বলতে চাই, সীমান্ত বলতে শুধু স্থলভাগকে বুঝায় না। আকাশ ও নৌপথেও কিন্তু সীমান্ত রয়েছে। এখন ভারত, মায়ানমার, দুবাই, সিঙ্গাপুর, আমেরিকা থেকে পণ্য কিন্তু বিমানবন্দর হয়ে আসে। সমুদ্র পথেও তো হিরোইন, ইয়াবাসহ সব ধরণের মাদক আসছে। এখানে এককভাবে তো বিজিবিকে দায়ী করা যায় না। তবে স্থলপথ বেশি থাকায় সবাই বিজিবিকে দায়ী করেন।

সমুদ্র পথ বিশাল। সীমান্ত পথে সাড়ে ৭শ’ কি.মি. কোস্টাল লাইন আছে। এই পথ তো বিজিবির দেখার সুযোগ নাই। প্রায় ৫ হাজার ফিসিং ট্রলার আছে। এসব ট্রলারে ইয়াবা আসে। যা বিজিবির দেখার সুযোগ নাই। বিমানেও আসছে। চুরি করে হলেও তো আসছে। 

অথচ সবাই বিজিবিকে দোষ দেয়। কিন্তু যারা বিক্রি করছে, খাচ্ছে তাদের পরিচয়ও প্রকাশ হওয়া উচিৎ। তাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। অভিভাবকদের সচেতনতা ও সন্তানদের নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। 

যদি দেশে ডিমাণ্ড থাকে তবে মাদক আসবেই। এ জন্য ডিমাণ্ড বন্ধ করতে হবে। আমাদের বিশাল সীমান্ত, নেই কাঁটাতারের বেড়া। আমি তো হাত দিয়ে ধরে আটকাতে পারবো না। 

আমেরিকার মতো দেশের মেক্সিকোর সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে। সেখানে স্যাটেলাইট ব্যবহার করেও মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান বন্ধ করতে পারছে না। আসলে ডিমাণ্ড থাকলে সাপ্লাই বন্ধ করা কঠিন। আমরা প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার মাদক জব্দ ও ধ্বংস করছি। কিন্তু কিভাবে আপনি বন্ধ করবেন? আমরা যাদের ধরেছি তারা কয়েক দিন পরই বেরিয়ে যাচ্ছে। ওপেনে মাদক বিক্রি হয়। এসব কেউ বন্ধ করছেন না।

তবে আমরা মাদকের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স দেখানোর চেষ্টা করছি। কোনো ধরণের ছাড় নয়। বিজিবির কোনো সদস্য মাদক পাচার ও চোরাচালানে জড়িত থাকলে তাদের চাকুরিচ্যুত করা হয়। বিজিবিকে ব্লেম দিলে চলবে না। 

মাদক পাচারে দেশের বাইরে যারা জড়িত তাদের মোকাবেলায় মায়ানমারের বিজিপি কিংবা ভারতের বিএসএফ এর সঙ্গে কী আপনাদের যোগাযোগ আছে?

আজিজ আহমেদ : আমরা প্রতিনিয়ত যোগাযোগ করি। তাদের কোন সীমান্ত এলাকার গোডাউন, কারখানা থেকে আসছে তা জানাই। বিএসএফ ধ্বংস করে। ফেন্সিডিল আসা অনেক কমে গেছে, কিন্তু ইয়াবা বন্ধ হচ্ছে না। এ ব্যাপারে মায়ানমার কোনো পদক্ষেপই নিচ্ছেন না। তারা সবচেয়ে বেশি ঝামেলা করছে।

আমরা প্রতি ৩ মাস পর পর মিটিং করছি। ২০১৪ সাল থেকে আমরা এই মিটিং শুরু করেছি। কিন্তু সব সময় হচ্ছে না। ইয়াবার প্রডাকশন বন্ধ হচ্ছে না। তারপরেও আমরা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছি। মায়ানমারের সহযোগিতা ছাড়া সম্ভব না। এটা বন্ধে কোস্টগার্ড, পুলিশ, বিজিবিসহ অন্য বাহিনী গুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টাও দরকার। 

 ওভারঅল চোরাচালন সম্পর্কে একটু বলুন। কেন বন্ধ হচ্ছে না? অন্য সংস্থারও কি দায় আছে?

আজিজ আহমেদ : চোরাচালান বন্ধে সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় নেই। কেউ কাউকে সহযোগিতা করছে না। এক সংস্থা ধরলে অন্য সংস্থা বলে আমরা তো ওইটা চেক করে ছেড়েছি, আপনারা আবার কেন ধরলেন? এসব আমরা অনেকবারই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি।

এমনও হয়েছে বৈধ পথে এসেছে অবৈধ জিনিষ। আমরা সেটা চেক করেছি। আমরা তা জব্দ করেছি। অবৈধ পণ্য বৈধ পথে কেন আসবে? আমাদের কাছে এর গণ্ডায় গণ্ডায় প্রমাণ রয়েছে। 

সীমান্ত দিয়ে বিভিন্নভাবে মাদকদব্য আসে। আমাদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমাদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে আসে। তাত্ত্বিকভাবে অনেক কিছু বলা যায়। কিন্তু বাস্তবে এসে দেখুন চিত্রটা।
সূত্র : জাগোনিউজ২৪

Post a Comment