২২ বছর ডাস্টবিনে কাটিয়ে জোটেনি কানাকড়িও


দুপুর দেড়টা। মাথার উপর তেজদীপ্ত সূর্যের উত্তাপ। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমির প্রবেশপথের অদূরে ঢাকা সিটি করপোরেশনের (ডিসিসি) বড় লোহার ডাস্টবিনের সামনে পড়ে থাকা ময়লা-আবর্জনা বেলচা দিয়ে তুলে ডাস্টবিনের ভেতরে ফেলছিলেন অশীতিপর এক বৃদ্ধ। 

হালকা-পাতলা গড়ন তার। চুল ও দাড়ি ধবধবে সাদা। মুখে দুপাটির ৩২ দাতের একটিও নেই। পরনে তেলচিটচিটে সাদা রংয়ের ঢিলেঢালা শার্টটা কনুই পর্যন্ত গুটানো। ছাই রংয়ের ফুল প্যান্টটাও হাঁটুর নীচ পর্যন্ত গুটানো। পায়ে ঢিলেঢালা মোজা দিয়ে পরিহিত একটি পুরোনো সাদা কেডস্। 

বেশ দ্রুত গতিতে রাস্তায় পড়ে থাকা ময়লা-আবর্জনা ডাস্টবিনে ফেলছিলেন। প্রচণ্ড গরমে দরদর করে ঘামছিলেন। মাঝে মাঝে হাঁপিয়েও উঠছিলেন, থামছিলেন। একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার কাজ শুরু করছিলেন।
এই বৃদ্ধের বয়স আশিরও বেশি। নাম তার আবদুর রহমান। রাজধানীর সেগুনবাগিচা এলাকার বাসিন্দারা তাকে ‘টপের বুড়া’ নামেই বেশি চেনেন। সেগুনবাগিচা এলাকার যত ময়লা-আবর্জনা শিল্পকলা একাডেমির এই ডাস্টবিনের সামনে ফেলা হয়, সেগুলো বেলচা দিয়ে তুলে ডাস্টবিনের ভেতর ফেলেন আবদুর রহমান। 

গত ২২ বছর ধরে এ কাজ করে আসছেন তিনি। উদয়াস্ত কাজ করা এই বৃদ্ধের রাতটা কাটে ডাস্টবিনের অদূরেই, ফুটপাথে। 

এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে আবদুর রহমান জানান, ডিসিসির কর্মচারী না হয়েও তিনি গত ২২ বছর ধরে এলাকার ময়লা আবর্জনা অপসারণের কাজটি করছেন। বিনিময়ে তিনি ডিসিসি থেকে একটি টাকাও পাননি। এলাকাবাসী খুশি হয়ে মাস শেষে কিছু টাকা-পয়সা দেন। তাই দিয়ে কোনভাবেই দিনাতিপাত করছেন। 

বৃদ্ধের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের জঙ্গলবাড়ি এলাকায়। বহু বছর আগে ঢাকায় চলে আসেন। প্রথম স্ত্রী মারা গেছেন। সে ঘরের দুই ছেলে ভারতের কোলকাতায় থাকেন। পরে বিয়ে করেছেন। সেই স্ত্রী জামালপুর থাকেন।
আবদুর রহমান জানান, আগে তার রোজগার ভালো ছিল। পাড়া-মহল্লায় ঘুরে ঘুরে ময়লা আবর্জনা সংগ্রহ করতেন। বিভিন্ন ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা প্রতিমাসে তাকে ৩শ-৪শ টাকা করে দিতেন। কিন্তু এখন স্থানীয় কমিশনারের লোকজন গাড়ি-বানিয়ে বাসা বাড়ি থেকে মাসিক চাঁদার ভিত্তিতে ময়লা সংগ্রহ করেন। তিনি ময়লা নিতে গেলে তাকে বকাঝকা করেন। 

৮০ বছরের এই বৃদ্ধের আশা কমপক্ষে আরো ১৫ বছর কাজ করে যেতে পারবেন তিনি। 

নিজের একটা দুঃখের কথা জানান আবদুর রহমান। তা হলো- বর্জ্য অপসারণে সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করলেও, সারাদিন সরকারের পক্ষে কাজ করলেও ২২ বছরে একটি টাকাও পাননি তিনি। 

এজন্য নিজের ভাগ্যকে দোষ দিয়ে তিনি বলেন, যতদিন বেঁচে আছি ততদিন শুধু ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কারের কাজ করে যাবো। দিনভর কাজ করাটা এখন অভ্যাস হয়ে গেছে, কোনো এক দিন কাজ না করলে সারা শরীর ব্যথা করে। 
সূত্র : জাগোনিউজ২৪

Post a Comment