আসন্ন রোজায় চিনি নিয়ে কারসাজির ইঙ্গিত


রোজা আসতে এখনো প্রায় আড়াই মাস বাকি। এরই মধ্যে রোজায় চিনির দাম বাড়ানোর জন্য ব্যবসায়ীরা নানা কারসাজি শুরু করেছেন। দেশে চিনি আমদানি স্বাভাবিক থাকলেও বাজারে সরবরাহ কম থাকায় কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়েছে। ফলে ইতোমধ্যে প্রতিকেজিতে চিনির দাম ৫ টাকা করে বেড়েছে। এদিকে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি) থেকে তাদের লোকসান কমাতে চিনির দাম আরও বাড়িয়ে প্রতিকেজি ৬০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, সরকারিভাবে চিনির দাম বাড়ালে বেসরকারি খাতেও এর প্রভাব পড়বে।

এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম অস্বাভাবিক মাত্রায় কমে সাম্প্রতিক সময়ে আবার কিছুটা বাড়তে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে প্রতিকেজি চিনির খুচরা বিক্রি হচ্ছে ১১ টাকা ৮৫ পয়সা দরে। গত জানুয়ারিতে ছিল ১১ টাকা ৮০ পয়সা। ফেব্রুয়ারিতে ১০ টাকা ৪০ পয়সা। গত বছরের সেপ্টেম্বরে ছিল ৯ টাকা ২০ পয়সা। বাংলাদেশে যেসব চিনি আমদানি হচ্ছে সেগুলোর বেশিরভাগই নভেম্বর থেকে জানুয়ারির মধ্যে এলসি খোলা হয়। ফলে এগুলোর দাম কম ছিল। আর একসঙ্গে বেশি চিনি আমদানি করলে এর দাম আরও কম পড়ে।

ট্যারিফ কমিশনের সূত্র জানায়, চিনি আমদানিতে ভ্যাট, ট্যাক্স পরিশোধ, পরিবহন খরচ ও ব্যবসায়ীদের মুনাফাসহ প্রতিকেজি চিনির মূল্য ৩৪ থেকে ৩৮ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। তারপরও বাজারে চিনির দাম কমছে না, বরং বাড়ছে।

দেশে বর্তমানে চিনির চাহিদা রয়েছে ১৪ থেকে ১৫ লাখ টন। প্রতি মাসে লাগে গড়ে ১ লাখ টন। তবে রোজা, ঈদ, পূজা বা অন্যান্য উৎসবের সময় চিনির চাহিদা বেড়ে যায়। বিশেষ করে রোজার সময় দেড় থেকে ২ লাখ টন চিনির প্রয়োজন হয়। চাহিদা বাড়ার এ সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীরা চিনির দাম বাড়িয়ে দেয়।

সূত্র জানায়, দেশে বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল রয়েছে ১৫টি। এগুলোয় বছরে প্রায় দেড় লাখ টন চিনি উৎপাদন হয়। বর্তমানে মজুদ আছে ১ লাখ ১৫ হাজার টন। বেসরকারি খাতে চিনিকল রয়েছে ৭টি। এর মধ্যে ২টি বন্ধ রয়েছে। এ মিলগুলো অনেক বড় আকারের হওয়ায় এতে উৎপাদিত চিনি দিয়ে দেশের চাহিদা মেটানো সম্ভব। এ খাতে উৎপাদন হয় সাড়ে ৩১ লাখ টন। এসব মিলে বার্ষিক উৎপাদন হয় প্রায় ৩৩ লাখ টন।

কিন্তু দেশে চিনি উৎপাদন করলে খরচ বেশি পড়ে। এদিকে আমদানি করা চিনি বাজারে কম দামে বিক্রি হয়। ফলে তাদের লোকসান হয়। এ কারণে ব্যবসায়ীরা এখন চিনির উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছেন। ব্যবসায়ীরা বাড়িয়ে দিয়েছেন চিনি আমদানি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানায়, গত জানুয়ারি মাসে প্রায় ১ লাখ ৪ হাজার টন চিনি আমদানি করা হয়েছে। প্রতি মাসে গড়ে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টন করে চিনি আমদানি হয়। এ হিসেবে দেশে চিনির সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার কথা।

আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম কমে যাওয়ায় এই খাত থেকে রাজস্ব আয় কমে যায়। এছাড়া সরকারি চিনি কলগুলোয় মজুদ চিনিও বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছিল না। এসব কারণে সরকার এর ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপ করে। গত ২৩ ডিসেম্বরে এনবিআর সব ধরনের চিনি আমদানির ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করে। প্রতিটন পরিশোধিত চিনির দর ট্যারিফ ভ্যালু নির্ধারণ করা হয় ৪৩০ ডলার, যা আগে ছিল ৪০০ ডলার। অশোধিত চিনির ট্যারিফ ভ্যালু ৩২০ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৩৫০ ডলার নির্ধারণ করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে যে দামই থাকুক সরকারকে প্রতি টনে ওই হারে শুল্ক দিতে হবে। ফলে চিনি আমদানির খরচ বেড়ে যায়। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম কমলেও দেশি বাজারের ভোক্তারা এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। বাড়তি কর পরিশোধ করেও প্রতিকেজি চিনি ৩৩ থেকে ৩৮ টাকায় বিক্রি করলেও ব্যবসায়ীদের মুনাফা থাকে। কিন্তু ওই দরে চিনি পাওয়া যাচ্ছে না।

জানুয়ারিতে মিলগেট রেট ও খুচরা বাজারে প্রতিকেজিতে চিনির দাম ৫ টাকা বাড়ানো হয়েছে। ফলে বর্তমানে মিলগেট থেকে ৫০ কেজির প্রতিবস্তা পাইকারিভাবে বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ১৮০ টাকা করে। প্রতিকেজির দাম পড়ছে ৪৫ টাকা ৮০ পয়সা। খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫২ টাকা কেজি দরে। এ দামেও সন্তুষ্ট নয় ব্যবসায়ীরা। তারা রোজা উপলক্ষে দাম আরও বাড়ানোর পাঁয়তারা করছেন। এ জন্য ব্যবসায়ীদের একটি গ্রুপ সিন্ডিকেট তৈরি করেছে।

প্রাপ্ত তথ্যে দেশে চিনির মজুদ ও আমদানি মিলিয়ে চাহিদার চেয়ে বেশি রয়েছে। তারপরও বাজারে প্রচার করা হচ্ছে চিনির সরবরাহ কম। সামনে দাম আরও বাড়ছে। এ কথা বলে পাইকারি ও খুচরা বাজারে চিনির সরবরাহ কমানো হয়েছে। এদিকে খুচরা ব্যবসায়ীদের পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন সামনে চিনির দাম আরও বাড়বে। এ ধরনের বার্তা চেয়ে এখন খুচরা ব্যবসায়ীরা চিনি মজুদ করা শুরু করেছেন।

বেসরকারি চিনি মিল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ সুগার রিফাইনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী সচিব এএইচএম রাশেদুজ্জামান বলেন, দেশে কী পরিমাণ চিনি আমদানি হচ্ছে, উৎপাদন কেমন করছে এর কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই। বরং মিল মালিকদের স্পষ্ট নির্দেশ কোনো ধরনের তথ্য সংবাদ কর্মীদের দেওয়া যাবে না।

সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) চিনিকলগুলোয় উৎপাদিত চিনির খরচ বেশি পড়ে। তাদের প্রতিকেজি চিনির উৎপাদন খরচ পড়ে ৮০-৯০ টাকা। আখ কেনা থেকে শুরু করে বিপণন পর্যন্ত প্রায় সব পর্যায়ে দুর্নীতির কারণে খরচ বেশি পড়ে। অথচ বাজারে তাদের প্রতিকেজি চিনি বিক্রি করতে হয় ৪৫ টাকা দরে। এতে প্রতিকেজিতে তাদের লোকসান হয় ৩৫ থেকে ৪৫ টাকা। ফলে তারা যত বেশি উৎপাদন করে তত বেশি লোকসান হয়। সরকারি চিনি কলগুলোকে লোকসানের হাত থেকে বাঁচাতে চিনির দাম অন্তত ৬০ টাকা হওয়া উচিত বলেও মনে করছে সরকারি প্রতিষ্ঠানটি।

এ বিষয়ে বিএসএফআইসির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক বিকাশ চন্দ্র সাহা জানান, সরকারি চিনিকল ও চাষিদের বাঁচাতে চিনির দাম বাড়ানোর বিকল্প নেই। প্রতিকেজি চিনি উৎপাদনে খরচ হয় ৮০-৯০ টাকা। অথচ অর্ধেকেরও বেশি লোকসান দিয়ে বিক্রি করতে হয়। এভাবে লোকসান দিলে চিনিশিল্প বিলুপ্তির পথে যাবে। তিনি জানান, চিনির দাম বাড়ানোর পাশাপাশি দক্ষ জনবল আর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবহেলা দূর করতে পারলে এ শিল্প আবারও উজ্জীবিত হবে বলেও মনে করেন তিনি।

উৎপাদন খরচ এত বেশি হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, গত বছর সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। ফলে আখ থেকে চিনি কম পাওয়া গেছে। চাষিদের খরচ পুষিয়ে দিতে বেশি দামে আখ কিনতে হয়েছে। এ কারণে দামও একটু বেশি পড়েছে।
সূত্র : আমাদের সময়

Post a Comment