জুমচাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন পাহাড়িরা


পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় বসবাসকারী পাহাড়িদের একটি বড় অংশ জুমচাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে। চিম্বুক সড়কের ম্রোলংপাড়ার জুমচাষি মেনুলু ম্রো বলেন, অতিবৃষ্টি এবং খরায় বান্দরবানে গত বছর জুমের ফসল ভালো হয়নি। পাহাড়ে পাঁচ একর জমিতে জুমচাষ করে আশানুরূপ ফলন পাওয়া যায়নি। বৃষ্টিতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এছাড়া ফলনও ভালো হয় না। ফলে জুমচাষ এখন আর আগের মতো লাভজনক নয়। এসব কারণে পূর্বপুরুষদের আদি পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন পাহাড়িরা। প্রতিবছরের মার্চ থেকেই জুমচাষের প্রস্তুতি শুরু হয়। ইতোমধ্যে পাহাড়ি অঞ্চলে এই প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। তারা পাহাড়ে আগুন দিয়ে লতাপাতা, আগাছা পুড়িয়ে জৈব সার তৈরির মাধ্যমে জমি প্রস্তুত করছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার মধ্যে বান্দরবানেই সবচেয়ে বেশি জমিতে জুমচাষ হয়। জেলায় প্রায় সাড়ে ১১ হাজার হেক্টর জমিতে জুমচাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। জেলা সদরের ডলুপাড়া, গেজমনিপাড়া, শৈলপ্রপাত, যৌথখামার এলাকা, কানাপাড়া, মেঘলা, মাঝেরপাড়া, আমতলীপাড়া, সাতকমলপাড়া, ফারুকপাড়া, বান্দরবান-চিম্বুক, বান্দরবান-রোয়াংছড়ি, বান্দরবান-রুমা-থানচি সড়কসহ জেলার সাত উপজেলার পাহাড়ে জুমচাষের প্রস্তুতি নিয়েছেন জুমিয়ারা (যারা জুম চাষ করেন)। এছাড়া রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায়ও জুমচাষের প্রস্তুতি চলছে। জুমে পাহাড়ি ধান, ভুট্টা, মরিচ, যব, সরিষা, মিষ্টিকুমড়া, টকপাতা, আদা এবং পেঁপেসহ বিভিন্ন রকম সবজির চাষ করা হয়। এর মাধ্যমেই অধিকাংশ দরিদ্র পাহাড়ি জীবিকা নির্বাহ করেন।

স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, কোনো পাহাড়ে একটি ফসল উৎপাদনের পর এক বছর খালি রাখতে হয়। পরবর্তী বছরে আবার ভালো ফলন হয়। কিন্তু এখন জুমিয়ারা প্রতিবছরই একই পাহাড়ে জুমচাষ করেন। এছাড়া বছরজুড়েই নানা ধরনের ফসল উৎপাদন করেন। পাহাড়ের গাছপালা কেটে ফেলার কারণে বৃষ্টিতে মাটি সরে গিয়ে পাহাড় ছোট হয়ে যাচ্ছে। ঘন ঘন ফসল উৎপাদনের ফলে জমির উর্বরা শক্তি কমে যাচ্ছে। এতে ফলন কম হচ্ছে, যা দিয়ে আগের মতো আর পুরো বছর চলে না। ফলে বাধ্য হয়ে পাহাড়িরা জুমচাষের পাশাপাশি অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন, বিশেষ করে তাতা বোনা, মাছ ধরা বা অন্য কোনো চাকরিতে।
পাহাড়ি গবেষক সিংইয়ং ম্রো বলেন, জুমচাষ আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। যুগ যুগ ধরে পাহাড়িরা জুম চাষ করে এলেও ইদানীং মিশ্র ফল চাষের দিকে ঝুঁকছেন তারা। তবে ম্রো জনগোষ্ঠী এখনো জীবিকার জন্য সম্পূর্ণ জুমচাষের ওপর নির্ভরশীল। অন্য সম্প্রদায়ের লোকজনের মধ্যে জুমচাষের প্রবণতা অনেকাংশে কমে গেছে।
বান্দরবানের ডলুপাড়ার বাসিন্দা মংসা থোয়াই মারমাসহ কয়েকজন জুমচাষির সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, তারা জুমচাষ এখন কমিয়ে দিয়েছেন। এর পাশাপাশি রাস্তার পাশে অনেকে ছোট দোকান দিয়েছেন। আবার অনেকে পাহাড় থেকে নানা কৃষিপণ্য তুলে শহরে বিক্রি করে কিছু আয় করেন। এভাবেই চলে তাদের সংসার। এখন আর জুমচাষের ওপর ভর করে জীবিকা নির্বাহ করতে পারছেন না।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, বান্দরবান জেলায় ২০১০ সালে সাড়ে ১৪ হাজার হেক্টর জমিতে জুমচাষ হয়। ২০১৫-তে এটি কমে দাঁড়ায় সাড়ে ১২ হাজার হেক্টর। রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতেও জুমচাষ কমছে। স্থানীয়ভাবে এখন পর্যটনশিল্পের বিকাশ ঘটায় এর সহযোগী হিসেবে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়ে গেছে। পাহাড়িরা এখন এসব পেশায়ও চলে আসছেন।
এছাড়া বেশিরভাগ পাহাড়ের দখল এখন আর পাহাড়িদের হাতে নেই। নানা কাজে সেগুলোকে ব্যবহার করছেন উচ্চবিত্তরা। এতেও জুমচাষের জমি কমে গেছে। উৎপাদিত ফসল দিয়ে নিজের চাহিদা মিটিয়ে বাড়তি ফসল তারা বাজারে বিক্রি করতে পারেন না চাহিদা না থাকায়। পাহাড়ি দুর্গম এলাকা থেকে সেগুলো কিনে অন্য জেলায় সরবরাহ দেওয়াও লাভজনক নয়। ফলে তারা উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না।
জানা গেছে, ২০১০ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পাহাড়ে আদার চাষ করতে ব্যাপক ঋণ দিয়েছিল। ফলে ওই অঞ্চলে আদার উৎপাদন বেড়েছিল ব্যাপক। কিন্তু বিপণন ব্যবস্থা না থাকায় ওই আদা তারা বিক্রি করতে পারেননি। ফলে ব্যাংকের ঋণও আদায় হয়নি। পাহাড়িরা তাদের আদার ন্যায্যমূল্য পাননি।
বিগত এগারো বছরে বান্দরবানের রোয়াংছড়ি, রুমা, থানছি, লামাসহ সাত উপজেলায় জুমের আগুনে পুড়ে মারা গেছে কমপক্ষে পনেরো জন। ঘরবাড়ি পুড়েছে কয়েকশর বেশি। মংলাইংপাড়া কারবারি মংচিং প্রু মারমা জানান, গত বছর জেলার লামার ফাসিয়াখালী এবং রুমা উপজেলায় মংলাইগ্রুপাড়ায় জুমচাষের জন্য পাহাড়ে লাগানো আগুনে নিজেদের (জুমচাষিদের) ৬৮টি ঘরবাড়ি পুড়ে গেছে। নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম-সোনাইছড়ি ইউনিয়নে ঘরবাড়িসহ কয়েকশ একর ফলদ-বনজ বাগান পুড়েছে।

রোয়াংছড়ি সদরের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান অংসুই মং মারমা জানান, জুমিয়াদের লাগানো জুমের আগুনে ঘরবাড়ি ছাড়াও ২০১২ সালে রোয়াংছড়িতে একই পরিবারের তিনজনসহ চারজন জুমের আগুনে পুড়ে মারা গেছে।
সূত্র : আমাদের সময়

Post a Comment