বাগেরহাটের সফল নারী উদ্যোক্তা রেহানা পারভীন


বাগেরহাট শহরের বেড়ে ওঠা এক সফল নারী উদ্যোক্তার নাম রেহানা পারভীন লাকী। বর্তমানে সামাজিক প্রতিষ্ঠান শাপলা ফুলেদর তিনি নির্বাহী পরিচালক। রেহানা পারভীন লাকীর মা ফাতেমা মুসলেমের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১৯৮০ সালে শহরের শালতলা এলাকায় ‘শাপলাফুল’ নামের একটি সামাজিক সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে।

তৎকালীন সময়ে জনসংখ্যা বিস্ফোরণ (ফ্যামিলি প্লানিং) এর কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে বাগেরহাট পৌরসভার হাতে গোনা কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে যাত্রা শুরু হয় শাপলাফুল নামক সংগঠনের। মায়ের মৃত্যুর পর ১৯৮২ সালে মাত্র ১২ জন কর্মীকে নিয়ে সংগঠনের অগ্রযাত্রা চালিয়ে নিতে হাল ধরেন লাকী। তখন তিনি কলেজ ছাত্রী। দীর্ঘ ৩৪ বছরের সংগ্রামের কারণে তার প্রতিষ্ঠান এখন বাগেরহাটে অসংখ্য মানুষের কল্যানে কাজ করতে সক্ষম হয়েছে।

জাগো নিজজের সাথে একান্ত সংক্ষাতকারের সুবাদে জানা যায়, সমাজে প্রতিষ্ঠিত এই সফল নারী রেহানা পারভীন লাকী বিভিন্ন সময়ে নানা পুরস্কারে ভূষিত হলেও তার শেষ ইচ্ছা উপকূলীয় অঞ্চলের নারীদের জন্য একটি বৃদ্ধাশ্রম ও মহিলা এতিমখানা প্রতিষ্ঠার। এক কন্যা সন্তানের জননী লাকী পড়াশুনা চলাকালীন সময়ে মা ফাতেমা মুসলেম এর আদর্শে আদর্শিত হয়ে সামাজিক কাজের দিকে ঝুঁকে পড়েন। সমাজের গরীব দুস্থ মানুষের জন্য কিছু করা, মায়ের সেই অনুপ্রেরণাতেই তিনি সফল হয়েছেন বলে অপকটে স্বীকার করলেন রেহানা পারভীন।

ব্যক্তিগত জীবনে ১৯৮২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ছাত্র বাগেরহাট শহরের হরিণখানা এলাকার মোসাদ্দেক মোর্শেদ মাশুকের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন লাকী। তবে ১৯৯৫ সালে স্বামীর অকাল মৃত্যুর পর ৭ মাসের শিশু মেয়ে আজরীনা আরবী নওরীনকে লালন পালনের পাশাপাশি চালিয়ে যেতে থাকেন সংগঠন শাপলাফুলের কার্যক্রম।

তিনি বলেন, এক সময়ে রেডক্রিসেন্ট করেছি, ছাত্রী থাকা অবস্থায় শুকলাল সংগীত বিদ্যাপীঠে গান শেখা ও নাচের প্রতি আগ্রহ ছিল। বড় হয়ে নাচ-গান আর করা হয়নি। মায়ের সামাজিক কাজে সহযোগিতার মাধ্যমেই সামাজিক কাজে হাতে খড়ি হতে থাকে। এক পর্যায়ে বাগেরহাট রেডক্রিসেন্টের নির্বাহী সদস্য হয়েছি। নারী দিবসসহ বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি অনুষ্ঠানে নারীদের মাঠে নিয়ে আসতে অনেক বেগ পেতে হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ২০ বছর আগে নারীরা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করাকে লজ্জা মনে করতো। কিন্তু এখন প্রেক্ষাপট অনেক পাল্টে গেছে। নারীরা তাদের অধিকারের প্রশ্নে এমনকি ক্ষমতায়নের বিষয়ে অনেক সোচ্চার। অনেক আগে নারীদের ঘরে ঘরে গিয়ে অনেক বুঝিয়েও অধিকারের বিষয়ে সোচ্চার করে তুলতে যথেষ্ট কষ্ট করতে হয়েছে। এখন তার সংগঠনের সাথে জড়িত অন্তত অর্ধশত নারী সামাজিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন বলে তিনি জানান।

এসময় উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বাগেরহাট সদর উপজেলার লাউপালার কবিতা রানী আজ জয়িতা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। রাখালগাছী ,যাত্রাপুর  ও খানপুর ইউনিয়নে কৃষ্ণা, রিনাসহ অনেকে সংরক্ষিত মহিলা সদস্য পদে নির্বাচন করছেন। যা ২০ বছর আগে কল্পনাও করা যায়নি।

কিভাবে এই সফলতা এসেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ১৯৮২ সালে মায়ের মৃত্যুর পর মাত্র ১২০০ টাকা বেতন নিয়ে কাজ শুরু করি। পরিবার পরিকল্পনার কাজ তখন সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমেও করা হতো। তারই অংশ হিসেবে বাগেরহাট পৌরসভার তৎকালীন ৩টি ওয়ার্ডে (সাভভেনশন কমিটি) অনুদানের মাধ্যমে শাপলাফুল সংগঠন কাজ শুরু করে। এ কাজের পাশাপাশি সামাজিক কাজও চলতো এখানে।

তিনি জানান, সংগঠনের ভালো কাজের স্বীকৃতি স্বরুপ তৎকালীন বাগেরহাটের এসডিও এম এ জামান শাপলাফুল সংস্থায় সেই সময়ে সংগঠনে কর্মরত ১২ জন মহিলাদের আর্থিক উপার্জন বাড়াতে একটি করে সেলাই মেশিন দেন। যা তখনকার দিনে অনেক উপকারী ছিল। ফলে অনেকে আগ্রহী হয় সামাজিক কাজ করতে। এভাবে সংগঠনের কার্যক্রম বাড়তে থাকে। ১৮৮২ সালে রেজিস্ট্রেশনও পায় সংগঠনটি।

১৯৮৯ সালের ১ জুলাই (ওডিআই) ওভারসিস ডেভলপ এ্যাডমিনিস্ট্রেটর (বিশিষ সংস্থা) বাগেরহাট সদর উপজেলার যাত্রাপুর, রাখালগাছি, খানপুর ও রারইপাড়া ইউনিয়নের প্রাইমারি হেলথ কেয়ারের জন্য আর্থিক সহযোগিতা দান করে। পরে এই কার্যক্রম প্রায় ৮ বছর অব্যাহত ছিল। পরবর্তিতে এ্যাডভোকেসি,সামাজিক অধিকার নিয়ে দীর্ঘ দিন সফলতার সাথে সমাজের পিছিয়ে পড়া নারীদের অগ্রসর করতে কাজ শুরু করে সংগঠনটি। বর্তমানে বাগেরহাট গোপালগঞ্জ, খুলনা জেলার ১৪ টি ইউনিয়নে সমাজের পিছিয়ে পড়া নারীদের জন্য পিকেএসপির আর্থিক সহযোগিতায় কাজ চলছে। এর পাশাপাশি জার্মান দাতা সংস্থা (এ.এন.ডি.আর.আই.এইচ.ই.এল. এফ. ই.) সহায়তায় হতদরিদ্র মহিলাদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আর্থিক অবস্থা পরিবর্তনের কাজ অব্যহত রয়েছে।

সফল এই নারী  দীর্ঘ দিন সমাজের অবহেলিত নারীদের নিয়ে কাজ করার জন্য অনেক সম্মাননা পেয়েছেন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সামাজিক সেক্টরে অবদানের জন্য চলতি বছর একুশে স্মৃতি সম্মাননা পদক-২০১৬ ও মাদার তেরেসা গোল্ড মেডেল-২০১৬ পেয়েছেন তিনি।

ব্যক্তিগত জীবনে একমাত্র মেয়ে নাওরীনকে বিয়ে দিয়েছেন। মেয়ের জামাই মেহেদী হাসান খুলনার সিনিয়র সহকারী জজ। তাদের কোল আলোকিত করে অল্পকিছুদিন আগে জন্মগ্রহণ করেছে এক সন্তান। নাতীকে নিয়ে খুব ভালোই দিন কাটছে বলে দাবি করেন এই সফল নারী।
সূত্র : জাগোনিউজ২৪

Post a Comment