**TRY FREE HUMAN READABLE ARTICLE SPINNER/ARTICLE REWRITER**

শীতলক্ষ্যা ও বালুর দূষিত পানি যাচ্ছে রাজধানীবাসীর পেটে


রূপগঞ্জ ও রাজধানী ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকার পয়বর্জ্য ও শিল্পবর্জ্য সরাসরি বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীতে গিয়ে পড়ছে। এতে দিন দিন দূষিত হয়ে পড়ছে এ দুই নদীর পানি। দূষণের মাত্রা এতটা ছাড়িয়ে গেছে যে এখন আর নদীর পানি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এতে সায়েদাবাদ ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টটি শীতলক্ষ্যা নদীর পানি শোধনে অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। 

এ প্লান্টে শীতলক্ষ্যার পানি শোধন করে গত ৪ বছর আগেও বিশুদ্ধ করে সরবরাহ সম্ভব হলেও বালু ও শীতলক্ষ্যার দূষণের মাত্রা এতটা বেড়েছে যে এখন আর পানি পুরোপুরি বিশুদ্ধ করে রাজধানীবাসীর জন্য সরবরাহ করা যাচ্ছে না। ফলে রাজধানীবাসীকে ওই দূষিত পানিই খেতে হচ্ছে। 

ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টে পানি বিশুদ্ধ করার পরও পানিতে দূরগন্ধ থেকে যাচ্ছে। পানিতে থাকে যাচ্ছে বিষাক্ত অতি খুদ্র কণা। আর এ পানি বিদেশী পানি বিশুদ্ধকরণ কোনো ফিলটারেও শুদ্ধ করতে পারছে না। অপরদিকে ফিলটারে ময়লা জমে তা সহসাই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। 

সায়দাবাদ ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের সারুলিয়া অফিসের কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এ নদীর পানিতে কেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড (সিওডি) যেখানে স্বাভাবিক মাত্রায় ৪ থেকে ১২ মিলিগ্রাম থাকার কথা সেখানে তা ক্রমশ ২৮ মিলিগ্রাম থেকে ১২৮ মিলিগ্রাম পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ নদীর পানিতে বিভিন্ন মাত্রায় মিশ্রিত অবস্থায় প্রাপ্ত রাসায়নিক পদার্থের মধ্যে রয়েছে এসিড, পারদ, ময়লা লিকার, ক্লোরিন, আর্সেনিক ও বিভিন্ন অদ্রবীভূত পদার্থের কণা। 

শোধনাগারের একটি সূত্র জানায়, বর্ষা মৌসুমে নদী ভরা থাকার কারণে সমস্যা কম হলেও শীত মৌসুমে পানির নাব্যতা হ্রাস পাওয়ায় এমনিতেই পানির প্রবাহ থাকে কম। ঐ অবস্থায় শীতলক্ষ্যা নদীর যে স্থান থেকে শোধনাগারের জন্য পানি উত্তোলন করা হয় তার মাত্র কয়েক মিটারের মধ্যে ঐ এলাকার বড় কয়েকটি কারখানার ডাইংয়ের বর্জ্য নিষ্কাশন করা হয়। পানি শোধনাগারের নদী থেকে পানি উত্তোলন এবং একই সময় ডাইংগুলো বর্জ্য নিষ্কাশন করায় পরিপূর্ণ বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা শোধনাগারের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। ফলে রাজধানীবাসীর অপরিচ্ছন্ন পানি সেবনের ফলে শরীরে বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি হচ্ছে।শীতলক্ষ্যা নদী আর আগের মত নেই। ১০ লাখেরও বেশি জনসংখ্যা অধ্যুষিত দুতীরের পয়নিষ্কাশন ব্যবস্থা চলে এ নদীতেই। তাছাড়া রাজধানীর সব ময়লা-আবর্জনা ফেলা হয় শীতলক্ষ্যার তীরে। ফলে দিনদিন দূষিত হয়ে পরছে এ নদী। এখনও গাঢ় কালো পানি দিয়ে মানুষ তার নিত্য প্রয়োজন মেটাচ্ছে। নোয়াপাড়া, রূপসী, মুড়াপাড়া, কাঞ্চন, ঘোড়াশাল, পলাশ ও তার আশপাশ এলাকার প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ কোনো না কোনোভাবে এই পানি ব্যবহার করছে। 

সায়েদাবাদ ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের মাধ্যমে রাজধানীবাসীও প্রতিদিন এ পানি ব্যবহার করছে নির্বিঘ্নে। সায়েদাবাদ ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের শীতলক্ষ্যার মূল উৎসস্থল সারুলীয়ায় রয়েছে প্লান্টের পাম্প হাউজ। এখানে থেকে শীতলক্ষ্যার পানি এনে ব্যবহার করা হলেও ঠিক তার উল্টো দিকে রূপগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী টাটকী খাল থেকে গাড় রং মিশ্রিত বিষাক্ত পানি এসে সরাসরি পড়ছে শীতলক্ষ্যায়। আর পানি বিশুদ্ধ করার জন্য নেয়া হচ্ছে সায়েদাবাদ প্লান্টে। 

দেখা গেছে, ঢাকা শহরের চারপাশের জলাভূমিগুলোতে কয়েক হাজার শিল্প প্রতিষ্ঠান অপরিশোধিত বর্জ্য নিক্ষেপ করে, যা শহরের সব পানির উৎস বিষাক্ত করে তুলেছে। খাবার পানির উৎস হিসেবে বাধ্য হয়ে ঢাকা ওয়াসা ভুগর্ভস্থ্য পানি ব্যবহার করছে। কিন্তু সেই পানিও সাম্প্রতিককালে দূষিত হতে শুরু করেছে। ফলে নগরবাসীর মধ্যে নানা রকম চর্মরোগের প্রাদুর্ভাব ঘটছে। কৃষি উৎপাদন ও মৎস্য আহরণও কমে যাচ্ছে। 

শীতলক্ষার পানি কিছুটা পরিষ্কার হলেও বালু নদীর পানি একেবারে কালো। কোনো নৌ যানবাহন চললেই তৈরি হচ্ছে সাদা ফেনা। দেখলে মনে হবে যেন কোনো ডোবা। আসলে এটি এক সময়ের মিষ্টি পানির নদী বালুর বর্তমান অবস্থা। অবৈধ দখল, সুয়ারেজ-শিল্প কারখানার বর্জ্য পড়ে তৈরি হয়েছে এ অবস্থা। এ নদীর পানি দিয়েই আশেপাশে চলছে চাষাবাদ। ফলে শুষ্ক মৌসুমে ফসল উৎপাদনের পরিমাণ কমে যায়। শিল্প-কারখানার বর্জ্যের কারণে নদীর বিশাল এলাকায় মাছের বদলে বসবাস করছে পোকা। 

এ ব্যাপারে রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. লোকমান হোসেন বলেন, শিল্পকারখানার দূষণ রোধ করা যাচ্ছে না বলেই এমনটা হচ্ছে। দূষণ রোধে পরিবেশ অধিদফতরকে লিখিত ভাবে জানানো হয়েছে বলেও তিনি জানান।

চাষী আব্দুল মালেক ও ইব্রাহিম জানালেন, পানি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় নদীর পাড়ের ঢাকা ত্রিমোহনী, লায়নহাটি, নাসিরাবাদ, দাসেরকান্দি, বালুরপাড়, বেড়াইদ, ধীৎপুর, রূপগঞ্জের নগড়পাড়া, পশ্চিমগাঁও, কামসাইর, নাওড়া, ইছাপুরাসহ বিশাল এলাকার দু-তিন ফসলি জমি এক ফসলি হয়ে গেছে। শুধু বোরো ধান ছাড়া এখানে অন্য কিছু হয় না। কারণ অন্য সময়ের ফসল এ পঁচা পানি সহ্য করতে পারে না। এ কারণে বালু নদীর দুই তীরের মানুষের আয় কমে গেছে। 

ঢাকা ওয়াসার একটি সূত্র জানায়, বালু নদীর মোট দৈর্ঘ্য বাইশ কিলোমিটার। ঢাকা থেকে দৈনিক দশ লাখ ঘনমিটার পয়বর্জ্য, বর্ষায় ৫৬ কোটি ঘনমিটার বর্জ্য মেশানো পানি, বিভিন্ন শিল্প কারখানার সাড়ে চারশ ঘনফুট বর্জ্য প্রতিদিন নদীতে পড়ছে। এছাড়া বালু, নরাই ও দেবধোলাই নদীর উপরে আছে সহস্রাধিক ঝুলন্ত পায়খানা। এসব থেকে আরো পাচঁশ ঘনফুট পয়বর্জ্য নদীতে মিশছে। 

ডা. রনি আহমেদ জানান, বালু নদীর পঁচা পানির কারণে অসুস্থ হয়ে প্রায়ই লোকজন এখানে চিকিৎসা নিচ্ছে। এ নদীর দূষণ বন্ধ করে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে এলাকাবাসী দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে যাচ্ছে। শীতলক্ষ্যা-বালু নদী বাঁচাও আন্দোলন কমিটিও হয়েছে। 

তবে সম্প্রতি হাইকোর্টের নির্দেশনা বালু নদীসহ দেশের নদীগুলিকে বাঁচাতে মাইলফলক হিসাবে কাজ করবে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদ ও পানি বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আমাদের অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ড এ অবস্থা তৈরি করেছে। এখন হাইকোর্টের নির্দেশনা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে নদীগুলোর পরিস্থিতি উন্নতি হবে।
সূত্র : জাগোনিউজ২৪

Post a Comment