স্বাবলম্বী হওয়ার মডেল জামালপুরের বানেছা বেগম


বানেছা বেগম এক উদ্যমী নারীর নাম। শত ঘাত-প্রতিঘাতও দমিয়ে রাখতে পারেনি জীবন সংগ্রামে সফল এ নারীকে। এক সময়ের অভাবী বানেছা বেগম হস্তশিল্পের কাজ করে নিজেকে স্বাবলম্বী করার সঙ্গে সঙ্গে অন্য নারীদের স্বাবলম্বী করতে ৫ হাজার নারী কর্মী নিয়ে গড়ে তুলেছেন হস্তশিল্পের বিশাল নেটওয়ার্ক। বানেছা বেগম এখন অনেক নারীর কাছে স্বাবলম্বী হওয়ার মডেল।

৪৫ বছর আগে বানেছা বেগমের বিয়ে হয় জামালপুর শহরের পশ্চিম নাছিরপুর এলাকার মো. মফিজ উদ্দিনে সঙ্গে। ৪ ছেলে (বাবুল হোসেন, বাহার আলী, মো.মুুকুল হোসেন, রনি আহম্মেদ) আর ২ মেয়েকে (মনোয়ারা পারভিন ও ময়না আক্তার) নিয়ে ভালই চলছিল তাদের সংসার। হঠাৎ করে দ্বিতীয় বিয়ে করে বসেন বানেছা বেগমের স্বামী মো. মফিজ উদ্দিন। স্বামী মফিজ উদ্দিন ২৮ বছর আগে স্ত্রী-সন্তানদের ফেলে চলে যায় দ্বিতীয় স্ত্রীর কাছে। স্বামী চলে যাওয়ায় বানেছা বেগম সন্তানদের নিয়ে চরম অভাবের মধ্যে দিনযাপন করতে থাকেন। তবে মনোবল একটুও দমে যায়নি। 

প্রায় ২৫ বছর আগে জামালপুর বিআরডিবির সমবায় সমিতি থেকে মাত্র ৮ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে স্বল্প পুঁজি দিয়েই শুরু করেন হস্তশিল্পের ব্যবসা। স্বল্প পুঁজি থাকায় প্রথমে জামালপুর শহরের বিভিন্ন দোকান থেকে অল্প অল্প কাজের অর্ডার নিয়ে তার হস্তশিল্পের ব্যবসা দাঁড় করান। সেখান থেকেই কঠোর পরিশ্রম করে তিলে তিলে পুঁজি বৃদ্ধি করে গড়ে তোলেন ‘অপর্ণ হস্তশিল্প’। ততদিনে তার হস্তশিল্পের কাজের সুনামও জেলার বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে হস্তশিল্পের অর্ডার আসতে থাকে। 

স্বল্প পুঁজি আর নাছিরপুর এলাকার হতদরিদ্র গুটি কয়েক নারী কর্মী নিয়ে হস্তশিল্পের ব্যবসা শুরু করলেও এখন তার ব্যবসার পরিধিও বৃদ্ধি পেয়েছে। তার প্রতিষ্ঠানে তৈরি করা নকশী কাঁথা, বেড কভার, শাড়ি, সালোয়ার কামিজ, থ্রি-পিস, পাঞ্জাবি, ফতুয়া, ছেলেদের কটি, ব্যাগ, কুশন কভার, পিলো কভার, ওয়ালমেট, শিশু ফ্রকসহ হস্তশিল্পজাত পণ্য ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, সুনামগঞ্জসহ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ঠাঁই পেয়েছে বিদেশেও। বর্তমানে বানেছা বেগমের তত্ত্বাবধায়নে হস্তশিল্পের কাজ করছেন ৫ হাজার নারীকর্মী। এক সময়ের অভাবী বানেছা বেগমের হস্তশিল্পের ব্যবসায় কাজ করে অভাব দূর করছে বহু অভাবী নারী কর্মী।
এই প্রতিষ্ঠানের হাতে তৈরি নকশী পণ্যের দামও তুলনামূলক কম। নকশী কাঁথা বিক্রি হয় ২০০০ থেকে ৭০০০ টাকা, বেড কভার ১২০০ থেকে ২০০০ টাকা, কুশন কভার ৫০০ থেকে ২০০০ টাকা, পিলো কভার ৩০০ থেকে ৭০০ টাকা, শাড়ি ১৫০০ থেকে ১০০০০ টাকা,  পাঞ্জাবি সুতি ৪০০ থেকে ২৫০০ টাকা, সিল্ক ১৫০০ থেকে ৩৫০০ টাকা, থ্রিপিচ ৫৫০ থেকে ৩০০০ টাকা, ফতুয়া ২৬০ থেকে ১২০০ টাকা, কটি ৪০০ থেকে ১০০০ টাকা, ওয়ালমেট ৪০০ থেকে ১৫০০ টাকা, ব্যাগ ১৫০ থেকে ৪০০ টাকা, পার্স ২৫ থেকে ২০০ টাকা, শিশু ফ্রক ৩০০ থেকে ৭০০ টাকা। মাসে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকার বিভিন্ন হস্তশিল্পজাত পণ্যের অর্ডার সরবরাহ হচ্ছে তার প্রতিষ্ঠান ‘অপর্ণ হস্তশিল্প’ থেকে। প্রতি মাসে সব খরচ বাদ দিয়েও বানেছা বেগমের উপার্জন হয় প্রায় ২৫-৩০ হাজার টাকা। বানেছা বেগম এই হস্তশিল্পের ব্যবসা করে তার চার ছেলেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনটি স্বর্ণ পদকসহ পেয়েছেন অসংখ্য সম্মাননাপত্র।

বানেছা বেগম বলেন, খুব অল্প বয়সেই বিয়ে হয় আমার। লেখাপাড়াও তেমন একটা করতে পারি নাই। তাই স্বামী ফালাইয়া রাইখা যাওয়ায় প্রথমে ৬ পোলাপান নিয়ে খুব কষ্ট করছি। কোন কোন সময় ঠিকমতো খাইতেও পারি নাই, কিন্তু আমি আমার মনের জোর একটুও কমাই নাই। ব্র্যাকে মেয়েগরে কাপড় সিলাই করতে দেইখ্যা আমার মাথায় বুদ্ধি আসে হস্তশিল্পের ব্যবসা দেয়ার। পরে বিআরডিবি থাইকা লুন নিয়ে ব্যবসা শুরু করছিলাম। এখনও মাঝে মাঝে ভাবি স্বামী চইলা যাওয়ায় কি দিন পার করছি? এখন আমি অনেক সুখে আছি আমার তেমন কোন অভাব নাই। আমি এখন অনেকেরে সাহায্য করি। 

তিনি আরও বলেন, ভাবতে ভালই লাগে ২০ বছর আগে অল্প কয়টা টাকা দিয়া হস্তশিল্পের ব্যবসা শুরু করছিলাম আর এখন সেই হস্তশিল্পের কাজ করা জিনিস ঢাকা, সিলেট ছাড়াও লন্ডন, মালেশিয়া যায়। তবে যে পরিমাণ কাজের অর্ডার পাই পুঁজির অভাবে সব কাজ নিতে পারি না। সরকারিভাবে সুদমুক্ত ঋণ দিলে আমার হস্তশিল্পের ব্যবসাটা আরো বাড়াইতে পারতাম।
সূত্র : জাগোনিউজ২৪

Post a Comment