নীরবেই চলে গেল খোকা ভাইয়ের মৃত্যুবার্ষিকী


চলচ্চিত্র সাংবাদিকতার কিংবদন্তি তিনি। চলচ্চিত্রকে তিনি ভালোবেসেছিলেন হৃদয় থেকে। ভাবতেন, বলতেন, লিখতেন- চলচ্চিত্র নিয়েই। শুধু তাই নয়, চলচ্চিত্রের প্রতি অগাধ ভালবাসার কারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতাকে ছেড়ে চলচ্চিত্র সাংবাদিকতায় যোগ দেন।

তাই তিনি রুপালী পর্দার বাইরে এই অঙ্গনের সবচেয়ে প্রিয় মুখ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। সাংবাদিকরাও যে চলচ্চিত্রের প্রাণপুরুষ হতে পারেন তার উজ্জল দৃষ্টান্ত তিনিই রেখে গেছেন। বলছি প্রখ্যাত চলচ্চিত্র সাংবাদিক আহমদ জামান চৌধুরীর কথা। কারও কাছে খোকা জামান, কারও কাছে খোকাভাই, আবার কারও কারও কাছে আজাচৌ নামে পরিচিত।

গেল রোববার, ৬ মার্চ ছিলো বরেণ্য এ মানুষটির তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। অনেকটা নীরবেই দিনটি কেটে গেল যেন। পরিবারের কিছু আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া তাকে নিয়ে ছিলো না আর কোথাও তেমন কোনো আয়োজন। অথচ বেঁচে থাকতে তিনি নিজ উদ্যোগে আয়োজন করতেন চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িত নানা ব্যক্তির জন্ম-মৃত্যু ও বিশেষ দিনগুলো।

আজাচৌ শুধু চলচ্চিত্র সাংবাদিকতা নয়, চলচ্চিত্রের কাহিনি, চিত্রনাট্য এবং গান রচনাতেও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। ‘পিচঢালা পথ’, ‘নতুন নামে ডাকো’, ‘নাচের পুতুল’, ‘বাদী থেকে বেগম’, ‘আগুন’, ‘যাদুর বাঁশি’, ‘মাস্তান’, ‘তুফান’, ‘শেষ উত্তর’, ‘লাভ ইন সিঙ্গাপুর’, ‘শ্বশুরবাড়ি’, ‘মিস লংকা’, ‘দূরদেশ’র মতো বিখ্যাত আর জনপ্রিয় সব চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লিখেছেন তিনি।

পিচঢালা এ পথটারে ভালবেসেছি, যেও না সাথী, নতুন নামে ডাকবো তোমায়, কে তুমি এলে গো, ও দরিয়ার পানি, এ বৃষ্টিভেজা রাতে চলে যেও না, চুরি করেছো আমার মনটা, মাগো তোর কান্না আমি সইতে পারি না, যাদু বিনা পাখি যেমন বাঁচিতে পারে না, এক বুক জ্বালা নিয়ে বন্ধু তুমি কেন একা বয়ে বেড়াও, বিদায় দাওগো বন্ধু তোমরা এবার দাও বিদায়, প্রেম পিরিতি চাই বলে সবাই আমায় পাগল বলে’র মতো লিখেছেন কালজয়ী কিছু চলচ্চিত্রের গানও।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের গোড়াপত্তনের আগে চলচ্চিত্রবিষয়ক পত্রিকা ‘সিনেমা’ প্রকাশ করে রীতিমতো বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছিলেন প্রয়াত ফজলুল হক (সাহিত্যিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ফরিদুর রেজা সাগরের বাবা)। তারই দেখানো পথ ধরে সৈয়দ মোহাম্মদ পারভেজ প্রকাশ করেন ‘চিত্রালী’। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য চিত্রালী হয়ে ওঠে আদর্শ। চিত্রালীকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে এসএম পারভেজের হাতকে শক্তিশালী করেন আহমদ জামান চৌধুরী।

অর্থাৎ খোকা ভাইয়ের সাংবাদিকতা শুরু জনপ্রিয় সিনেমা পত্রিকা ‘চিত্রালী’র মাধ্যমে ১৯৭০ সালে। এরপর নানা দায়িত্ব পালন শেষে পত্রিকাটির সম্পাদনার দায়িত্বও পালন করেন দীর্ঘ ১০ বছর। সব মিলিয়ে চিত্রালীর সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন দীর্ঘ ২০ বছর। চিত্রালীর পর তিনি দু’বছর ফিচার এডিটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়েও ফিল্ম এন্ড মিডিয়া বিষয়ের ওপর পাঠদান করেছেন।

আরো একটি মজার তথ্য রয়েছে এই মানুষটির। আজকের কিংবদন্তি চলচ্চিত্র অভিনেতা রাজ্জাককে ‘নায়করাজ’ উপাধিটি তিনিই দিয়েছিলেন আশির দশকে। সেই কথা নায়করাজ নিজেও কৃতজ্ঞচিত্তে স্বীকার করেন এবং গর্বভরে সেটি বলেও বেড়ান।

খোকা ভাইকে মনে রাখার প্রচেষ্টায় চলচ্চিত্র সাংবাদিকদের সংগঠন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি (বাচসাস) তার স্মরণে ‘আজাচৌ’ পদক প্রবর্তন করেছে। ২০১৪ সালে প্রবর্তিত প্রথম এই পুরস্কারটি পেয়েছেন প্রয়াত চলচ্চিত্র সাংবাদিক মোহাম্মদ আওলাদ হোসেন।

এদিকে এফডিসি তো বটেই, বিনোদন বা চলচ্চিত্র সাংবাদিকদের কাছেও উপেক্ষিত ছিলো দিনটি। এ নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন চলচ্চিত্রের প্রবীন অভিনয় শিল্পী ও সাংবাদিকেরা। তারা বলেন, ‘মাত্র তিন বছর পেরিয়ে এসেছি আমরা এই গুণী মানুষটিকে হারানোর পর। অথচ এই অল্প কিছু দিনের মধ্যে অকৃতজ্ঞের মতো ভুলতে বসেছি ঢাকাই ছবিতে তার অবদান, প্রচেষ্টা, উন্নয়ন ভাবনা ও আজীবনের ভালোবাসা। জন্ম-মৃত্যু দিনগুলো ছাড়া তাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। চলচ্চিত্র বিষয়ক সাংবাদিক সংগঠনগুলো আজ ব্যক্তি স্বার্থ উদ্ধারে ব্যস্ত। তারা না করে স্বজাতের উন্নয়ন ভাবনা না করে গুণী মানুষদের অমর করে রাখবার চেষ্টা। তেমনি খোকা ভাই খ্যাত সাংবাদিকদের এই প্রয়াত অভিভাবককে নিয়েও খুব বেশি স্মরণায়োজন চোখে পড়েনি তার তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে।’

তারা আরো বলেন, আজাচৌ-এর মত চলচ্চিত্র প্রেমিককে ভুলে যাওয়াতে এই অঙ্গনের মানুষদের দৈন্যতারই পরিচয় দেয়। তার নামে কেবল একটি পদক প্রবর্তন করেই দায় এড়ানো যায় না, বর্তমান প্রজন্মের চলচ্চিত্র সাংবাদিক ও চলচ্চিত্রের মানুষদের কাছে তার অবদান তুলে ধরা উচিত। তার জন্য খোকা ভাইয়ের জীবন ও তার চলচ্চিত্রপ্রেমকে সবার কাছে পৌঁছাতে হবে।

Source : jagonews24

Post a Comment