আঙুল বাঁকা করেই সরাতে হলো ট্যানারি


ট্যানারি নিয়ে টানাটানি বহু দিনের পুরোনো একটা বিষয়। হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে স্থানান্তরের জন্য সরকার কয়েকবার আলটিমেটাম দিলেও কোনবারই অগ্রগতি খুব বেশি ছিল না। সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে ট্যানারি স্থানান্তরে দেরির পেছনে রাজনৈতিক জটিলতাসহ মূল কারণ ছিল মালিকদের গড়িমসি। এরইমধ্যে ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু জানিয়ে দেন, এপ্রিল থেকে রাজধানীর হাজারীবাগে কাঁচা চামড়া ঢুকতে পারবে না।  

আর এ আলটিমেটাম বাস্তবায়নে সরকার যে বদ্ধপরিকর ছিল তা বোঝা গেল ৩১ মার্চ দিবাগত রাতেই। ৩১ মার্চের পর হাজারীবাগের ট্যানারিগুলোতে নতুন করে আর কোনো কাঁচা চামড়া প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। আর এর ফলে বাধ্য হয়ে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরিয়ে নিচ্ছেন মালিকরা।

কয়েকজন পুলিশ সদস্য জানান, আগে থেকেই বিষয়টি নির্ধারিত ছিল। এ কারণে মালিকরা সেভাবেই কাজ করেছেন। তবে পুলিশ তৎপর আছে। কোনোভাবেই কাঁচা চামড়া নিয়ে প্রবেশ করতে দেয়া হবে না। ফলে ট্যানারি সরানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। ইতোমধ্যে অনেক কারখানার যন্ত্রপাতি সরানো হয়েছে। কাঁচা চামড়া যাতে প্রবেশ করতে না পারে সে জন্য ট্যানারি এলাকায় পুলিশের টহল বাড়ানো হয়েছে। প্রবেশপথগুলোতে বসানো হয়েছে চেকপোস্ট।

স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, চামড়া কারখানাগুলোতে মূলত রাত ১২টার পর থেকে মালামাল খালাসের কাজ শুরু হয়। তবে দিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ঠেলাগাড়ি দিয়ে চামড়া আসতো। এগুলো কারখানাগুলোর সামনে রাখা হতো। কিন্তু বৃহস্পতিবার রাতে চামড়ার ট্রাকের বিশাল লাইন থাকলেও শুক্রবার সকালে তা দেখা যায়নি। 

তবে যেসব কারখানা বৃহস্পতিবার ভোর রাতের মধ্যে কাঁচা চামড়া প্রবেশ করাতে পারেনি তারা সেগুলো কারখানার সামনে রেখেছিল। কিন্তু পুলিশি তৎপরতার কারণে শুক্রবার সকালে চমড়া কারখানার ভেতরে নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তবে অন্য দিনের মতো কারখানার সামনে কাঁচা চামড়া যত্রতত্র রাখতে দেখা যায়নি। ফলে চামড়া কারখানাগুলোর সামনের পরিবেশ ছিল বেশ পরিচ্ছন্ন। তাছাড়া ছুটির দিন হওয়ায় কারখানাগুলো ছিল বন্ধ। 

এ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকার যে আলটিমেটাম দিয়েছিল তা বাস্তবায়ন হচ্ছে। এপ্রিল মাসের প্রথম দিন কারখানায় কোনো কাঁচা চামড়া প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি।

অনেকটা পুলিশি হয়রানির ভয়েই হাজারীবাগে কাঁচা চামড়া প্রবেশ করছে না বলে জানিয়েছেন তারা। তবে কাঁচা চামড়া হাজারীবাগে না প্রবেশ করলেও পোস্তায় তা সাময়িক সময়ের জন্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা। 

এদিকে, হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি স্থানান্তরের জন্য সরকারের আল্টিমেটাম, হাইকোর্টের নির্দেশ, আন্তর্জাতিক চাপে এ শিল্প সাভারে স্থানান্তর করার প্রক্রিয়া প্রায় শেষ পর্যায়ে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের ধরে রাখার চেষ্টা। সব মিলিয়ে অস্তিত্ব সংকটে আছেন ট্যানারি মালিকরা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ট্যানারি মালিক বলেন, চট্টগ্রামে যেসব কাঁচা চামড়া ক্রয় করা হয়েছে সেগুলো বৃহস্পতিবার রাতে হাজারীবাগের কারখানায় এসেছে। শুক্রবার সকালের মধ্যে সেগুলো কারাখানায় ঢুকানো হয়েছে। তবে শুক্রবার সকালে কোনো কারখানার সামনে সেই চামড়া রাখা হলেও পুলিশের তৎপরতায় সেগুলো কারখানার ভেতরে নেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, প্রতিদিন কাঁচা চামড়া কেনা হচ্ছে। সেগুলো হাজারীবাগের কারখানায় প্রবেশের সুযোগ না দিলেও সাময়িকভাবে পোস্তায় রাখা হচ্ছে।

বাংলাদেশে ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান (মিজান) বলেন, হাজারীবাগ থেকে সাভারের চামড়া শিল্প নগরীতে যাওয়ার প্রক্রিয়া শেষের দিকে। সেখানে কার্যক্রম শুরু করা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। তবে যেসব ব্যবসায়ীর কাঁচা চামড়া কেনা রয়েছে তাদের চামড়া হাজারীবাগে প্রবেশ করতে দেয়া উচিৎ বলে মনে করেন তিনি।
   
হাজারীবাগ ইব্রাহিম ট্যানারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপকালে তারা বলেন, আমাদের কিছু মালামাল বৃহস্পতিবার রাতে চট্টগ্রাম থেকে এসেছে। সব মালামাল রাতে কারখানায় প্রবেশ করাতে পারিনি। ফলে কারখানার সামনে কিছু চামড়া রাখা ছিল। শুক্রবার সকালে পুলিশ এসে সেগুলো কারখানার ভেতরে রাখতে বলে। পরে সেগুলো কারখানায় ভেতরে নিয়ে রেখেছি। তবে নতুন করে কেনা চামড়া হাজারীবাগ কারখানায় আনা হবে না বলেও জানান তারা।

হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে স্থানান্তরে অনেক সময় পেলেও, এখন যখন সরকার কঠোর হয়েছে তখন ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করছেন, সরকারের পক্ষ থেকে যেভাবে চাপ দেয়া হচ্ছে, তাতে এ শিল্পের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সূত্র : জাগোনিউজ২৪

Post a Comment