বিপদসংকুল উপত্যকা, দুঃসাহসী যাত্রা


তারা পাঁচজন মিলে একটা গাড়িতে ব্যাগ বোঝাই করে নিজেরা ঠাসাঠাসি করে বসেছেন। গন্তব্য এমন এক উপত্যকা, যেখানে যেতে হলে গাড়ি চালাতে হবে রক্ত হিম করা দুর্গম রাস্তা দিয়ে। তারা সবাই রোমাঞ্চপ্রিয় অভিযাত্রী। রাস্তা যে শ্বাসরুদ্ধকর বিপজ্জনক, এবং সেই বিপদ মাথায় নিয়ে তারা যাবেন- এটাই ভেবেই তারা মোহগ্রস্ত।

ভারতের হিমাচল প্রদেশে একটি পৌরাণিক গুপ্ত উপত্যকা রয়েছে। নাম পাঙ্গি উপত্যাকা। জায়গাটা পশ্চিম হিমালয়ের পির পঞ্জল রেঞ্জ এবং জনস্কার রেঞ্জ নামের একগুচ্ছ পাহাড়ের মাঝখানে লুকানো। পাঙ্গিতে যাওয়ার জন্য সাধারণ মানুষ যে রাস্তা ব্যবহার করেন সেটা ভারী তুষারপাতের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। এই রাস্তা বন্ধ হলে পাঙ্গি উপত্যকাও অদৃশ্য হয়ে যায়। এই অদৃশ্য জায়গায় যাওয়ার জন্য তখন আর একটাই পথ। তাদেরকে যেতে হবে জম্মু ও কাশ্মীরের কিশতাওয়ার পৌরসভার ভেতর দিয়ে অতি দুর্গম আরেকটি রাস্তা দিয়ে।

নভেম্বর মাসে ঐ অঞ্চলের আবহাওয়া এমনিতেই চঞ্চল থাকে। তুষারপাত শুরু হলে পাঙ্গি উপত্যকা মাসের পর মাস বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে দুনিয়া থেকে। কিন্তু এই দুঃসাহসী ৫ জন সেখানে যাবেই। তারা রওয়ানা করেছে ভারতের চন্ডিগড় থেকে। দুই দিন পাকা রাস্তায় গাড়ি চালিয়ে শেষকালে যে রাস্তায় পৌঁছালেন সেটাকে কোনমতেই রাস্তা বলা যাবে না। পাহাড়ের গায়ে ডিনামাইট বসিয়ে কোনোক্রমে গর্ত তৈরি করা হয়েছিল মাত্র কয়েক বছর আগে। সেটাই হচ্ছে রাস্তা। এখান দিয়ে পায়ে হাঁটাই দুষ্কর, অথচ তারা ঢুকেছেন গাড়ি নিয়ে। যেকোনো সময় গাড়ির চাকা পিছলে যাবে, গিয়ে পড়বে একপাশের গভীর শূন্যে।      

পাঙ্গি নিয়ে অনেক কথা প্রচলিত আছে। অনেকে বলেন, মুঘল আক্রমণকারীদের হাত থেকে পালাতে গিয়ে হিমাচল প্রদেশের প্রাচীন শহর ছাম্বার অধিবাসীরা আশ্রয় নিয়েছিল এই উপত্যকায়। অভিজাত পরিবারের লোকেরা তাদের নারী ও শিশুদের এইখানে পাঠাতো গোপনে শান্তিতে বাস করার জন্য। ১৬শ’ শতকে যখন এই উপত্যকা ছাম্বা রাজত্যের অধীন হয় তখন যে সমস্ত প্রহরীকে এখানে পাঠানো হত তাদেরকে কবরের খরপাতি দিয়ে পাঠানো হত। কারণ ধরেই নেয়া হত তারা আর ফিরবে না। আবার অনেকে এও বলেন যে, ছাম্বা রাজা তার রাজ্যের সমস্ত অপরাধীদের এখানে পাঠাতেন যাবজ্জীবন সাজা দেয়ার জন্য।

পাঙ্গিতে যাওয়ার এই রাস্তায় কষ্টেসৃষ্টে একটা গাড়ি যেতে পারবে। যদি দুটো গাড়ি মুখোমুখি হয় তাহলে একজনকে পেছনের দিকে যেতে হবে। রাস্তার একপাশে পাহাড়, আরেকপাশে কয়েক হাজার ফিট নিচে ছিনাব নদী। রাস্তাটা এতোই খানাখন্দ এবং পাথরে ভর্তি যে ৩০ কিলোমিটার উঠতে ৪ ঘণ্টা লাগলো তাদের।

পাঙ্গিতে স্থানীয় আদিবাসীরা রয়েছে। এরা পাহাড়ে কৃষিকাজ করার সুযোগ পায় না, পশু চরিয়ে দিন কাটায়। কথা বলে তিব্বতের ভাষায়। পাত্রু নামে একটি শক্তিশালী মদ তৈরি করে এরা। শীতকালে গোটা উপত্যকা তুষারে মোড়া থাকে বলে এটা স্থানীয়দের জন্যও খুবই কঠিন একটা সময়। মানুষ অসুস্থ হলে হেলিকপ্টার ছাড়া চিকিৎসার উপায় নেই।

পাঁচজনের এই অভিযাত্রী দলটি যখন বাড়ির পথে ফিরতে শুরু করে তখন উপত্যাকায় পাক খাচ্ছে ঘন কুয়াশার মত মেঘ, সেইসাথে শুরু হয়েছে তুষারপাত। তুষারে পিচ্ছিল হয়ে গেছে রাস্তা। পাহাড় থেকে ৫২ কিলোমিটার নিচে নামতে তাদের সময় লাগলো ৮ ঘণ্টা।কিন্তু তারা যদি সময়মত নামতে না পারতেন, তাহলে হয়তো অনন্তকাল থেকে যেত হতো ঐ ভয়ঙ্কর নির্জন স্বর্গীয় উপত্যকায়।
সূত্র : বাংলামেইল২৪

Post a Comment