পঞ্চগড়ে ভেজাল বীজের কারণে তরমুজের ফলনে বিপর্যয়


পঞ্চগড়ের বিভিন্ন উপজেলার তরমুজ ক্ষেতে ফলন বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। আর তাই ফলের বিপরীতে এখন ক্ষেতে শোভা পাচ্ছে শুধুই লতানো বড় বড় গাছ। ভেজাল বীজের কারণেই ফলন নেই বলে দাবি করছেন তরমুজ চাষিরা। এতে ক্ষতির মুখে পড়েছেন কয়েকশ কৃষক। 

প্রায় এক যুগ ধরে এই মৌসুমে তরমুজ চাষ করে বেশ লাভবান হচ্ছিলেন সদর উপজেলার হাফিজাবাদ ও হাড়িভাসা ইউনিয়নের কৃষকরা। তরমুজ চাষ অধিক লাভজনক হওয়ায় স্থানীয় ক্ষুদ্র কৃষকরা এই আবাদের পর নানান আপদ মোকাবেলা করে থাকেন। কিন্তু এবার খরচের টাকা নিয়েই দুঃচিন্তায় তারা।

সরেজমিনে সদর উপজেলার হাফিজাবাদ এবং হাড়িভাসা ইউনিয়নের বিভিন্ন তরমুজ ক্ষেত ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ তরমুজ ক্ষেতে শুধুই বড় বড় লতানো গাছ। ফলের খবর নেই। অনেক কৃষক ফলনের আশাও ছেড়ে দিয়েছেন। তারা আর ক্ষেতে যান না। কৃষকদের দাবি, গত বছরও ফলন কম হয়েছিল। তবে এবার ১০ শতাংশ ফলন হবে কি না এ নিয়েই তাদের সন্দেহ।

হাফিজাবাদ ইউনিয়নের জঙ্গলপাড়া গ্রামের একটি তরমুজ ক্ষেতের পাশে দাঁড়াতেই এগিয়ে এলেন তরমুজ চাষি সানাউল্লাহ নুরী। সাংবাদিক পরিচয় শুনে কাছে এসেই বললেন, ‘আমরা এবার শেষ। আমাদের ঠকানো হয়েছে, ভুয়া বীজের কারণে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। 

তিনি জানালেন, এবার তিনি ১ লাখ ২০ হাজার টাকা খরচে ১০ বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন। আশায় ছিলেন গতবারের মত এবারও বাম্পার ফলন হবে। কিন্তু তার বিশালাকারের তরমুজ ক্ষেত ঘুরে কোনো ফলন দেখা গেলো না। শুধুই বড় বড় গাছ। দু’একটি গাছে ফল থাকলেও অকালে নষ্ট হয়ে গেছে সেই ফল। মৌসুমের নির্ধারিত সময়ের পরও ক্ষেতে ফলন এর বিপরীতে শুধুই গাছ দেখে হতাশ সানাউল্লাহ নুরী। অথচ প্রত্যাশিত বড় আকারের তরমুজ পেতে এই সময়ে প্রতিটি গাছে ১টি অথবা ২টি করে ফল রেখে অসংখ্য ফল ফেলে দেওয়া হতো। 

সানাউল্লাহ নুরী বলেন, প্রতি বছর এই মৌসুমে তরমুজ আবাদ করি। এই আবাদের আয় থেকে অনেক কিছুই করেছি। এবারও আশায় ছিলাম। কিন্তু হলো না। এবার খরচও উঠবে না। পঞ্চগড় বাজারের রাজু বীজ ভাণ্ডার থেকে উন্নত জাতের তরমুজের বীজ কিনেছিলাম। বীজের কারণেই ফলনের এই অবস্থা। কৃষি বিভাগেরও কোনো খবর নেই।

সানাউল্লাহ নুরীর ক্ষেতের মত হাফিজাবাদ ও হাড়িভাসা ইউনিয়নের বিভিন্ন ক্ষেতেরও একই অবস্থা। একই ইউনিয়নের বামনপাড়া গ্রামের তরমুজ চাষি সফিকুল ইসলাম আলম আর তরমুজ ক্ষেতে যান না। তার তরমুজ ক্ষেত বড়বড় গাছ আর আগাছায় ভরে গেছে। এসব এখন গরুর খাদ্য বলে জানালেন তিনি। 

পেশায় আইনজীবী সহকারী তরমুজ চাষি সফিকুল ইসলাম বলেন, তরমুজ চাষে গত বছর বিঘা প্রতি ২০ হাজার টাকা আয় করেছি। এবার ৩ বিঘা জমিতে ৩০ হাজার টাকা খরচে ফিলকিং নামে উন্নতজাতের বীজ বপন করেছি। এই সময় ফলের জন্য ক্ষেতে গাছ দেখা যেতো না। কিন্তু এবার মনে হচ্ছে ১০ শতাংশ ফলনও হবে না।

হাফিজাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের ৫নং ওয়ার্ড সদস্য ওছমান গনী বলেন, প্রায় ১ যুগের বেশি সময় ধরে আমাদের এলাকার কৃষকরা এই মৌসুমে ব্যাপকভাবে তরমুজ আবাদ করেন। সেই আবাদের আয় দিয়ে ক্ষুদ্র কৃষকরা মেয়ে বিয়ে দেন। অনেকে বড় ধরনের আর্থিক সমস্যা কাটিয়ে উঠেন। এবারও এলাকায় ব্যাপক তরমুজ চাষ হয়েছে। এতোদিন ফল বড় হওয়ার কথা। কিন্তু বৃষ্টির অভাবে তরমুজ ক্ষেতে তেমন ফল নেই।

জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ৬৭৩ হেক্টর জমিতে তরমুজ আবাদ হয়েছে। এই জমিতে ২৮ হাজার মে. টন এর বেশি তরমুজ ফলনের আশা করছেন কৃষি বিভাগ। কিন্তু বৃষ্টির অভাবে তরমুজ গাছ বড় হওয়ায় (অঙ্গজ বৃদ্ধি) ফলন কিছুটা কম দাবি কৃষি বিভাগের। তবে বীজের কোনো সমস্যা হলে ক্ষতিপুরণের ব্যবস্থার কথাও জানান জেলা কর্মকর্তা। 

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, এ বছর কৃষকরা তরমুজের ফলন নাকি কম পাচ্ছেন। তারা সাধারণত উন্নত জাতের (হাইব্রিড) ড্রাগন, সুপার এম পিআর, ফিলকিং বীজ বোপন করে থাকেন। এসব বীজ ভালো কোম্পানির কাছ থেকে নিলে প্রতারিত হওয়ার কথা না। তবে নামকরা কোম্পানি ছাড়া যদি তারা ভুয়া কোম্পানির বীজ কিনে থাকেন তাহলে এমন হতে পারে। 

তিনি আরো জানান, তারা যদি ভুয়া বীজের প্যাকেটসহ (মোড়ক) আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আইনগত সহায়তা চায় সেক্ষেত্রে আমি কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে তাদের ক্ষতিপুরণ পেতে সহায়তা করবো।
সূত্র : জাগোনিউজ২৪

Post a Comment