ক্ল্যাসিকো জ্বরে কাঁপছে ফুটবল বিশ্ব


ন্যু ক্যাম্পে যখন ক্লাব সঙ্গীত গাইতে পরস্পর পাশাপাশি দাঁড়াবে বার্সেলোনা এবং রিয়াল মাদ্রিদের ফুটবলাররা, তখন কিছুক্ষণের জন্য হলেও এক হয়ে যাবে দুটি দল। তখন তারা আর পরস্পরের শত্রু থাকবে না। একে অপরের সঙ্গে মিশে যাবে। ফুটবল কিংবদন্তী ইয়োহান ক্রুয়েফকে সম্মান জানাতে কিছুক্ষণের জন্য গ্যালারিও হয়ে যাবে নীরব। রিয়াল এবং বার্সেলোনার চীর প্রতিদ্বন্দ্বী দর্শকরা মিলে যাবে এক স্রোতে। কী অভাবনীয় এক দৃশ্যই না তৈরী হবে তখন!

সম্পূর্ণ জাতীয়তাবাদের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা দুটি ফুটবল ক্লাব। বিশ্বের ইতিহাসে এতটা জাতীয়তাবাদ ভিত্তিক কোন ক্লাব এভাবে প্রভাব বিস্তার করে রাখতে পেরেছে কি না সন্দেহ। খেলাধুলায় তো ‘রাজনীতি’ই পুরোপুরি নির্বাসিত; কিন্তু ব্যতিক্রমটা শুধু স্পেনেই। সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই তৈরী হয়েছে ‘রয়্যাল’ (রিয়াল) মাদ্রিদ এবং বার্সেলোনা। যে দুটি ক্লাব সরাসরি প্রতিনিধিত্ব করছে স্প্যানিশ জাতীয়তাবাদ এবং কাতালান জাতীয়তাবাদের।

তবুও বিশ্বের সবচেয়ে সফল এবং সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় ক্লাব এ দুটি। কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থের ঢেউ খেলে ন্যু ক্যাম্প-বার্ন্যাব্যুতে। ২০১৪ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিনের হিসেব মতে শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালি এবং জনপ্রিয় ক্লাব হচ্ছে রিয়াল মাদ্রিদ এবং বার্সেলোনা।

স্প্যানিশ শাসকদের একনায়কতন্ত্র এবং স্বৈরাচারের প্রতিবাদেই মূলতঃ গড়ে উঠেছিল বার্সেলোনা। কাতালুনিয়ান জনগনের প্রানের প্রতিষ্ঠান হিসেবে, তাদের অধিকার আদায়ের প্রতীক হিসেবেই নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে বার্সেলোনা ক্লাবটি। যে কারণে এক সময় ক্লাবটির স্লোগানই হয়ে দাঁড়িয়েছে, ‘মেস কিউ আন ক্লাব’ (মোর দ্যান এ ক্লাব)। অথ্যাৎ ‘ক্লাবের চেয়েও বেশি কিছু।’ কাতালুনিয়ানদের স্বাধিকার আদায়ের লক্ষ্যে সর্বাগ্রে কাজ করাই যেন বার্সার একমাত্র উদ্দেশ্য।

ঠিক রাজনৈতিক কারণেই স্প্যানিশ ফুটবলে যখন রিয়াল মাদ্রিদ আর বার্সেলোনা মুখোমুখি হতো, তখন সেখানে তৈরী হতো বৈরী রাজনৈতিক পরিবেশ। তুমুল উত্তেজনা এবং মাঠে চলতো ধুন্ধুমার লড়াই। গ্যালারি থেকে শুরু করে মাঠের সবুজ ঘাস- সব জায়গায় যেন মূর্ত হয়ে উঠতো স্প্যানিশ এবং কাতালান জাতীয়তাবাদের বিরোধ। সেই ১৯৩০ সাল থেকে এই বিরোধ স্পষ্ট হতে হতে শুধু বেড়েছে। মোরবো : দ্য স্টোরি অব স্প্যানিশ ফুটবলের লেখক ফিল বাল এল ক্ল্যাসিকো নিয়ে লিখেছেন, ‘খেলার মাঠে তারা একে অপরকে এতটাই ঘৃণা করে যে, তা বাকি বিশ্বের কাছে রীতিমত বিস্ময়কর।’

এখন তো কাতালানদের স্বাধীনতার প্রশ্নে রাজনৈতিক বিরোধ আরও বেশি। যার প্রভাব পড়েছে বার্নাব্যু কিংবা ন্যু ক্যাম্পেও। মেসি-নেইমার-সুয়ারেজ থেকে শুরু করে রোনালদো-বেল-বেনজেমারা যতই বিদেশী হোন, এল ক্ল্যাসিকো মানেই যেন স্পেনের জাতিগত বিরোধের মুর্ত প্রতীক তারা। একে অপরের প্রতিনিধিত্ব করে সেই বিরোধটাকেই চাঙ্গা করে তোলেন খেলার মাঠে।

তবে স্পেন জাতীয়তাবাদ বনাম কাতালান জাতীয়তাবাদের এই দ্বন্দ্ব এখন আর শুধু স্পেনেই সীমাবদ্ধ নেই। ফুটবলের বিশ্বায়নের কারণে এই দ্বন্দ্ব এখন ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। সারা বিশ্বে তাদের যে পরিমান ভক্ত এবং সমর্থক- তাতে এল ক্ল্যাসিকো মানে ফুটবল বিশ্ব ভাগ হয়ে পড়ে দুটি শ্রেনীতে।

ক্ল্যাসিকোর কম করে এক সপ্তাহ আগে থেকেই বাড়তে থাকে উত্তেজনার পারদ। কোথাও কোথাও তো বাক-বিতণ্ডাও হয়ে যায়। এমনকি সেটা গড়া হাতাহাতি পর্যন্ত। এল ক্ল্যাসিকোর এমনই প্রভাব। স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন প্রত্যাশা করছে বিশ্বের প্রায় ১৮৪টা দেশে দেখানো হবে এল ক্ল্যাসিকো। এবং প্রায় ৬০০ মানুষ দেখবে ফুটবলের শাশ্বত এই চিরন্তন লড়াইটি। 

পেশাদার ফুটবলের নিয়মানুযায়ী বছরে দু’বার অন্তত রিয়াল মাদ্রিদ আর বার্সেলোনা মুখোমুখি হবেই। স্পেনে চলা জাতীয়বাদের দ্বন্দ্বটা যেন এই দু’বার নতুন নতুন মাত্রায় রূপ পায়। তবে শুধু দু’বার না কখনও কখনও এই মুখোমুখি হওয়ার সংখ্যাটা ৫ থেকে ৬ বারও হয়ে যায়। কোপা ডেল রে, স্প্যানিশ সুপার কাপ কিংবা উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ- এসব জায়গায় রিয়াল-বার্সার মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা প্রচুর।

ধারাবাহিকভাবেই এবার স্প্যানিশ লা লিগায় মওসুমের শেষ এল ক্ল্যাসিকোয় মুখোমুখি রিয়াল মাদ্রিদ এবং বার্সেলোনা। যদিও পয়েন্ট টেবিলে ১০ পয়েন্ট পিছিয়ে রিয়াল। তাতে কী। ক্ল্যাসিকো মানেই ক্ল্যাসিক লড়াই। কথায় বলে, হাতি মরলেও দাম লাখ টাকা। রিয়াল এই ম্যাচে জিতলেও হয়তো শিরোপা পাবে না। কিন্তু ক্ল্যাসিকো উত্তেজনা তো আর এমনি এমনি কমবে না। যতক্ষণ না মাঠে খেলা না গড়ায়।

খেলোয়াড় হিসেবে প্রচুর ‘এল ক্লাসিকো’-তে তিনি মাঠে ছিলেন। বেশ কিছু দর্শনীয় গোল করে জিতিয়েছনও। এমনকী, আনচেলোত্তির সহকারী হিসেবে রিজার্ভ বেঞ্চে থেকেও এই মহারণের উত্তাপ নিয়েছেন; কিন্তু এই প্রথমবার পুরোদস্তুর কোচ হিসেবে জিনেদিন জিদানের আত্মপ্রকাশ ঘটতে চলেছে। কোচ হিসেবে অভিষেক ক্লাসিকোতে, কিছুটা হলেও চাপে রয়েছেন জিদান।

একে তো শীর্ষে থাকা বার্সেলোনার থেকে ১০ পয়েন্টে পিছিয়ে তার দল। তার ওপরে প্রথম লেগে ঘরের মাঠে ০-৪ বিধ্বস্ত হওয়া, যা এখন রিয়াল সমর্থকদের কাছে দগদগে ক্ষতের সমান। তবে ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে জিদান জানালেন, পুরনো জিনিস মনে রাখতে চান না। বরং, নতুন চ্যালেঞ্জ নেওয়াটাই তার কাছে আপাতত লক্ষ্য। ‘যেভাবে খেলেছি শেষ কয়েকটা ম্যাচ, কালকের ম্যাচটাও সেভাবেই খেলতে চাই। ইদানীং আমরা ভালই খেলছি। সেই ছন্দটাই ধরে রাখতে চাই’, স্পষ্ট বলে দিয়েছেন জিদান।

স্বাভাবিকভাবেই এদিন কথার শুরুতেই উঠে আসে প্রথম লেগের হারের কথা। জিদানের সাফ উত্তর, ‘আমি ওই ম্যাচটায় খেলোয়াড়দের সঙ্গে একটা কথাও বলিনি। ওরা জানে কী ঘটেছিল। আমি সেই ম্যাচটা পরে বিশ্লেষণ করে দেখেছি কোথায় ভুল ছিল। শনিবারের ম্যাচে সেটা আর হবে না। এই ম্যাচটা যে করেই হোক আমাদের জিততে হবে।’

এখানেই থেমে না গিয়ে জিদান যোগ করেন, ‘ক্লাসিকো আমার কাছে কোনও পরীক্ষা নয়। এটা স্রেফ আরেকটা ম্যাচ, যেটা গুরুত্বপূর্ণ। এই ধরনের খেলাগুলো সব সময়েই কঠিন। তবে মানুষ চায় ভাল ফুটবল দেখতে এবং আমি চাই আমার দল ঠিক সেটাই করুক।’

অবধারিতভাবে উঠে আসে দলের প্রধান তারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর প্রসঙ্গও। সম্প্রতি যিনি দেশের হয়ে পেনাল্টি মিস করে মেসিদের খাতায় নাম লিখিয়েছেন। জিদান তাতে অবশ্য ভয়ের কিছু দেখছেন না। বলে দিলেন, ‘এটা নিয়ে ভাবার কোনও কারণ নেই। পেনাল্টি মিস করা খেলারই একটা অঙ্গ। ক্রিশ্চিয়ানো দ্বিতীয় খেলাতেই বুঝিয়ে দেবে ও কী করতে পারে। ও নিজেও চিন্তায় নেই। খুশি মনেই শিবিরে যোগ দিয়েছে। তাই আমরাও খুশি।’

প্রতিপক্ষের আক্রমণের তিন তারকাই ছন্দে। নেইমার বাদে বাকি দুই তারকাই গোল পেয়েছেন। সেটা কি আপনাকে চিন্তায় রাখবে? মুচকি হেসে জিদানের উত্তর, ‘ওদের নিয়ে আমি ভাবতে যাব কেন? আমরা নিজেদের মতো খেলব। মানুষ যা ভাবে ভাবুক, রিয়েলকে হারানো সহজ হবে না।’

Source : jagonews24

Post a Comment