অবশেষে জিরা চাষে সাফল্য

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধীনে বগুড়ার শিবগঞ্জের মসলা গবেষণা কেন্দ্রের গবেষকরা দীর্ঘ ৮ বছর ধরে দেশে জিরা উৎপাদনে সফলতা আনার চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। বগুড়া, দিনাজপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহীসহ বিভিন্ন জেলায় বারবার চেষ্টা চালিয়ে তারা ব্যর্থ হচ্ছিলেন। অবশেষে সেই চেষ্টা সফল হতে চলেছে।

চলতি বছর রাজশাহীর তানোর উপজেলার কলমা বহড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল হামিদের ১৩ শতাংশ জমিতে সফলভাবে জিরা চাষ করা সম্ভব হয়েছে। আর তাতেই আশার আলো দেখতে শুরু করেছেন কৃষিবিদ ও মসলা গবেষণা কেন্দ্রের গবেষকরা।

ব্যক্তি উদ্যোগে দেশে এই প্রথম জিরা চাষ করে সফল হলেন কৃষক আব্দুল হামিদ। নিজের বাড়ির পাশে ১৩ শতাংশ জমিতে জিরা চাষ করেন তিনি। চাষের কৌশল ও ফসল রক্ষার জন্য তিনি নিয়মিত যোগাযোগ করতেন বগুড়া মসলা গবেষণা কেন্দ্রের গবেষকদের সাথে। এতে তিনি সফলও হয়েছেন। বর্তমানে তার ক্ষেত থেকে পাকা জিরা ঘরে উঠতে শুরু করেছে।

কৃষক হামিদ জানান, ধান চাষ করে প্রায় ১০ বছর ধরে লোকশানে ছিলেন তিনি। তাই ধান চাষের পাশাপাশি পটল, করলা, সিম, ফুলকপি চাষে ঝুঁকে পড়েন। ফলনও ভাল হচ্ছিল। কিন্তু ২০১৪ সালে দেশে নির্বাচন কেন্দ্রিক ৩ মাস আন্দোলন হওয়ায় তার ক্ষেতের সবজি মোকামে পাঠাতে না পেরে নষ্ট হয়ে যায়। এতে তার প্রায় দুই লাখ টাকা লোকশান হয়। সেই থেকে তিনি এই সব ফসল উৎপাদন বন্ধ করে দেন।

সেই লোকশান তুলতে তিনি নতুন চিন্তা শুরু করেন। তার চিন্তা অল্প ফসল করে বেশি লাভ কার যায় কীভাবে। সেই সময় তিনি মসলা জাতীয় কিছু চাষ করার পরিকল্পনা করেন। তিনি তানোরের দুবইল গ্রামের শ্রেষ্ঠ কৃষক প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পদক প্রাপ্ত ইউসুফ মোল্লার পরামর্শ গ্রহণ করে জিরা চাষ করার সিদ্ধান্ত নেন।
কৃষক হামিদ জানান, গত বছর তার বিয়াই (মেয়ের শ্বশুর) চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাটের মিরপুর গ্রামের সাদেক বিশ্বাস ভারতে চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলেন। সেই সময় তার বিয়াইকে জিরার বীজ আনার জন্য অনুরোধ করেন। সাদেক বিশ্বাস ৫ কেজি জিরার বীজ এনে তাকে ১ কেজি দিয়েছিলেন। বাকি ৪ কেজি তার বিয়াই ভোলাহাটের মিরপুর গ্রামের ৫ বিঘা জমিতে বপন করেছিলেন। আর হামিদ ১৩ শতাংশ জমিতে পরিক্ষামূলক ৬০০ গ্রাম জিরার বীজ বপন করেছিলেন। এরপর থেকে তারা বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বগুড়া মসলা গবেষণা কেন্দ্র থেকে পরামর্শ গ্রহণ করতেন। এক সঙ্গে দুই জন চাষ করলেও সাদেক বিশ্বাসের ৫ বিঘা জিরার ক্ষেত নষ্ট হয়ে যায়। শুধু তার ১৩ শতাংশ জমিতে সফলভাবে জিরা চাষ হয়।

হামিদ আরো জানান, জিরা চাষ করা অনেক কষ্টের কাজ। গাছগুলি লাজুক। আবহাওয়া অনুকূলে না থাকলে জিরা চাষে সফলতা আসবে না। তবে এবার সফল হওয়ায় আগামী মৌসুম তার নিজের বীজ দিয়ে ৫ বিঘা জমিতে জিরা চাষ করবেন বলেও জানান তিনি।

তিনি আরো জানান, বীজ রোপনের ৮০ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে ফসল ঘরে উঠবে। এই ৮০ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে ২ থেকে তিনবার সরেজমিনে ক্ষেতে এসেছেন মসলা গবেষণা কেন্দ্রের গবেষকরা।

মসলা গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (উদ্ভিদ রোগ তত্ত্ব) আব্দুল ওয়াদুদ বলেন,‘দীর্ঘ ৮ বছর রাজশাহী, বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, দিনাজপুরসহ উওরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় জিরা চাষ করে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। এসব জেলার মাটিতে  চেষ্টা চালিয়েও জিরার ফলন আনতে পরিনি। তবে এই বছরে সফল হওয়ায় আমরা আনন্দিত।’ 

আব্দুল ওয়াদুদ আরো বলেন, ‘জিরা গাছ একটু লাজুক। যেকোনো মাটিতে চাষ করা যায় না। তানোরের মাটি জিরা চাষের উপযোগী বলে আমাদের মনে হয়েছে। এই গাছগুলি রোপনের পর থেকে পানি ব্যবহার করতে হবে ঝাঁঝরের মাধ্যমে। বিষ প্রয়োগ করতে হবে ৭ দিন পর পর। এই গাছে পাতা মরা রোগ বেশি হয়। তাই খুব সর্তকভাবে গাছ রোপনের পর থেকে কৃষিবিদদের পরামর্শে পানি ও বিষ প্রয়োগ করতে হবে।’

বাংলাদেশের মাটিতে জিরা চাষ করে একদিন জিরার চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সূত্র : বাংলামেইল২৪

Post a Comment