ভাষা শহীদদের একমাত্র ছবিটি তুলেছিলেন তিনি!


তাকে এ প্রজন্মের অনেকেই চিনেন না। শুধু এ প্রজন্মের নয়, শিল্প-সংস্কৃতি নিয়ে খুব বেশি খোঁজ খবর না রাখা আরো বেশ কয়েকটি প্রজন্মই হয়তো তাকে চিনতে গিয়ে অনেক কাঠখড় পোড়াবেন। 

কিন্তু তার পরিচয়গুলো এত উজ্জ্বল আর গর্বের যে সেগুলো জানতে গেলেও মনের মধ্যে অন্যরকম আনন্দ কাজ করে। কেননা, জীবদ্দশায় তিনি নিজেই জীবন্ত ইতিহাস হয়েছিলেন। বলছি একুশে পদক জয়ী প্রখ্যাত আলোকচিত্রী আমানুল হক। এই মানুষটিই ৫২’র ভাষা আন্দোলনে শহীদদের একমাত্র ছবিটি তুলেছিলেন! 

এই কিংবদন্তি ফটোগ্রাফার আরেক কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালীসহ বিভিন্ন চলচ্চিত্রের স্থির আলোকচিত্রী হিসেবে কাজ করেছিলেন। আর এইসব কারণে তিনি বাংলা ভাষা ও শিল্প-সংস্কৃৃতির ইতিহাস হয়ে আছেন।

আজ আমানুল হকের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। গেল ২০১৩ সালের ৩ এপ্রিল ৮৮ বছর বয়সে পরলোক গমন করেন তিনি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত একা একা নিভৃতে বসবাস করেছেন রাজধানীর শাহবাগে আজিজ কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটির একটি ফ্ল্যাটে। 

আমানুল হক সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে ১৯২৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ডাক্তার আবদুল হকের সাত ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে আমানুল হক ছিলেন দ্বিতীয়। তার বাবার ডায়েরিতে লেখা তথ্য থেকে জানা যায়, আমানুল হকের জন্মতারিখ ৬ নভেম্বর ১৯২৫ (২৬ কার্তিক, ১৩৩২ বাংলা) সাল, শনিবার সময় সন্ধাবেলা। তার ডাকনাম ছিলো মতি। 

বাবার অনুপ্রেরণায় ছোটবেলা থেকেই তিনি আঁকাআঁকি করতেন। বড় হয়ে কিছুদিন আর্ট কলেজে লেখাপড়াও করেছেন। পরে তিনি চাকরি পান ঢাকা মেডিকেল কলেজে আর্টিস্ট কাম ফটোগ্রাফার পদে। মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তিনি এঁকে দিতেন মেডিকেলের শিক্ষার্থীদের জন্য।

এই ফ্রিল্যান্স আলোকচিত্রীর ক্যামেরাতেই ধরা পড়ে ৫২’র ভাষা আন্দোলনের অনেক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ভাষা শহীদ রফিকের গুলিবিদ্ধ মরদেহের ছবিসহ অসংখ্য বিরল ছবি ক্যামেরায় ধারণ করেছিলেন আমানুল হক, যা পরের দিন পত্রিকাগুলোতেও প্রকাশিত হয়।

পরে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের সময় আমানুল হকের তোলা শহীদ রফিকের  ছবিটি পোস্টার করে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে প্রচার চালানো হয়েছিল। ফলে তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়ে কলকাতায় পাড়ি জমান। 

এই দেশান্তর হওয়া তার জীবনে নিয়ে আসে দারুণ আরেক সুযোগ। সেখানে গিয়ে তিনি সান্নিধ্য পান চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের। তার সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করেন আমানুল হক। সত্যজিৎ রায় তাকে খুবই পছন্দ করতেন। তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিলো ভাইয়ের মতো। শোনা যায়, অকৃতদার এই আলোকচিত্রীকে সত্যজিৎ রায়ের স্ত্রী অসংখ্যবার রান্না করে খাইয়েছেন।

আমানুল হক নেই আজ তিন বছর পেরিয়ে গেল। তাকে নিয়ে চোখে পড়ে না তেমন কোনো আলোচনা বা আয়োজন। তাকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরবারও কোনো প্রচেষ্টা নেই। তার কাছের মানুষদের সূত্রে জানা যায়, ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন নিভৃতচারী। নির্দিষ্ট কিছু মানুষ ছাড়া আর কারো সঙ্গে তিনি মিশতেন না। খ্যাতির মোহ ছিলো না। তার ধ্যান জ্ঞান সবই ছিলো ক্যামেরা, নেগেটিভ, লাইট আর ছবির নানা রকম বিষয়। 

তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে আমানুল হকে প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি। যেখানেই থাকুন, ভালো থাকুন তিনি।
সূত্র : জাগোনিউজ২৪

Post a Comment