তামাকের বিকল্প পাচ্ছেন না উত্তরবঙ্গের কৃষকরা


সামাজিকভাবে নিরুৎসাহিত করা হলেও চাষের জন্য তামাকের বিকল্প খুঁজে পাচ্ছেন না উত্তরবঙ্গের কৃষকরা। তামাকের পরিবর্তে খাদ্য বা অর্থকরী ফসল উৎপাদন করে খরচ পুষিয়ে নিতে পারছেন না তারা। এছাড়া অন্য কোনো ফসল উৎপাদন করে ন্যায্য মূল্য না পেয়ে হতাশ ও ক্ষুব্ধও তারা।

তামাক চাষে সরকারের বাস্তবমুখী নীতি প্রণয়নের দাবি জানিয়ে কৃষকরা বলছেন, তামাক চাষ বন্ধ করে কৃষকের অথনৈতিক ক্ষতি করার চেষ্টা করলেও তামাকজাত পণ্য উৎপাদন এবং বাজারজাতকরণ বন্ধে সরকারের কোনো পদক্ষেপ নেই। এতে কৃষকরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি হাজার কোটি টাকা রফতানি আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশ। তবে উপায়ন্তুর না পেয়ে উত্তরবঙ্গের অনেক কৃষক আবার তামাক চাষে ঝুঁকছে। 

এক যুগ আগেও উত্তরবঙ্গ তথা বৃহত্তর রংপুর বিভাগের জেলাগুলোতে প্রধান অর্থকরী ফসল ছিল তামাক। এ অঞ্চলের মাটির উর্বরতা চাষের জন্য বিশেষ উপযোগী বলে কৃষকরা তামাক চাষে বেশ উৎসাহিত ছিল। তামাক চাষেই ওই অঞ্চলের কৃষকরা স্বনির্ভর হয়ে ওঠে। উত্তরবঙ্গের অভিশাপ মঙ্গা দূরীকরণেও তামাকের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন তারা। শত বছরের ফসলটি উৎপাদনে ওই অঞ্চলের কৃষকরা বিশেষ অভিজ্ঞও। এছাড়া তামাকের উপর নির্ভর করে উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে বিভিন্ন শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। দেশে তামাকজাত দ্রব্যের বেশিরভাগরই যোগান আসে উত্তরবঙ্গের জেলাগুলো থেকে। 

বিভিন্ন কোম্পানির তত্ত্বাবধানে চাষ হলেও ওই অঞ্চলের সাধারণ কৃষকরাও নিজস্ব উদ্যোগে তামাক চাষে লাভবান হন। উন্নতমানের এসব তামাক ভারতসহ বিশ্বের অনেক দেশে রফতানি হয়ে থাকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তামাক চাষে উত্তরবঙ্গের চাষীদের নানাভাবে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। সরকারের পাশাপাশি তামাক চাষ বন্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা হচ্ছে। সরকারের এ প্রচেষ্টাকে অনেকেই সাধুবাদ জানিয়েছেন। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে তামাক চাষে নিরুৎসাহিত করা, তার কোনো প্রতিফলন না ঘটায় ক্ষুব্ধ ওই অঞ্চলের কৃষকেরা। তারা মনে করছেন, তামাক চাষ বন্ধের পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র আছে। তামাকের ব্যবহার বন্ধ না করতে পেরে তামাক চাষ বন্ধ করে দেয়া আত্মঘাতি সিদ্ধান্তের সামিল। এতে করে বাইরের দেশের জন্য তামাক বা তামাকজাত পণ্যের বাজার খুলে যাবে। 

লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা উপজেলা টংভাঙা ইউনিয়নের বাসিন্দা আওলাদ হোসেন বলেন, তামাক চাষ আমরাও করতে চাই না। আমার পরিবারের কেউ তামাক ব্যবহারও করে না। তবুও বংশ পরম্পরায় আমরা তামাক চাষ করে আসছি। এর একমাত্র কারণ হচ্ছে তামাক চাষে যে লাভ, তা অন্য কোনো ফসলে হয় না। 

তিনি আরো বলেন, ধান বা ভুট্টা চাষে যে খরচ হয়, সেই তুলনায় মূল্য পাওয়া যায় না। এ কারণেই তামাক চাষ এ অঞ্চলে জনপ্রিয়। তিন বছর আগে তামাক চাষ বন্ধ করে দিয়েছিলাম। লাভ হয়নি। বাধ্য হয়ে তামাক চাষে ফিরতে হয়েছে। 

তামাক নিয়ে বাংলাদেশ বাইরের কোনো শক্তির ষড়যন্ত্রের শিকার উল্লেখ করে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার চাপানি ইউনিয়নের সুরেন্দ্রনাথ বলেন, শুনেছি, ভারতে তামাক রফতানিতে উৎসাহিত করা হয় এবং এক্ষেত্রে ট্যাক্স ফ্রি করে দেয়া হয়। আর আমাদের এখানে তামাক চাষই বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। মূলত পাশ্ববর্তী দেশের ষড়যন্ত্রের কারণেই এমনটি হচ্ছে বলে আমরা মনে করি। এদেশে তামাক চাষ বন্ধ হলে দেশে বিড়ি-সিগারেট উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে পাশ্ববর্তী দেশেগুলো থেকে চোরাই পথে এদেশের বিড়ি-সিগারেটের বাজার ভরপুর হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে সরকার প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হবে। 

একই এলাকার বাসিন্দা মনোয়ার হোসেন বলেন, মাটির উর্বরতা কমে যাচ্ছে বলে তামাক চাষের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে। আমরা ত্রিশ বছর ধরে একই জমিতে তামাক চাষ করে আসছি, কিন্তু মাটির উর্বরতায় কোনো ঘাটতি দেখা দেয়নি। 

তিনি বলেন, কৃষকের দিক বিবেচনা না করে বাইরের কোনো গোষ্ঠীর পরামর্শে এভাবে একটি পণ্যচাষে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে পুরো অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কোনো বিকল্প না দেখিয়ে, তামাক চাষ এভাবে বন্ধ করে দেয়া সমচিন হবে না।
সূত্র : জাগোনিউজ২৪

Post a Comment