**TRY FREE HUMAN READABLE ARTICLE SPINNER/ARTICLE REWRITER**

কোয়ান্টাম ইলেক্ট্রোডাইনামিক্সের জন্মকথা


গোয়েন্দাগিরিতে বিজ্ঞানীরা শার্লকস হোম কিংবা ব্যোমকেশ বক্সীর চেয়ে কম যান না। বরং খাঁটুনিটা তাদের ঢের বেশি। মহাবিশ্বের অপার জগতে তাঁদের সূত্র হাতড়ে বেড়াতে হয়। প্রবেশ করতে হয় অণু-পরমাণুর মাইক্রোস্কোপিক জগতেও।

কিছু কিছু আবিষ্কার একই সাথে কণা-জগৎ ও মহাজগতের দুইয়েরই প্রতিনিধিত্ব করে। ইশ্বর কণা বা হিগস বোসন তাদেরই একটা। নিঃসন্দেহে হিগস বোসন একালের সেরা আবিষ্কারগুলোর একটা। কিন্তু এই কণা খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দিন-রাত এক করে খাঁটতে হয়েছে। অবশেষে সন্ধান মিলেছে বহুল আরাধ্য সেই কণার।

বিংশ শতাব্দীর তিরিশের দশক কেবল। পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, মহাবিশ্ব দাঁড়িয়ে আছে দু'ধরনের বলের খুঁটিতে ভর দিয়ে। একটা হলো মহাকর্ষ বল আর অন্যটা তড়িচ্চুম্বকীয় বল। দুনিয়ায়, মহাবিশ্বে যা কিছু ঘটছে তা এই দুটি বলের কারণে। এই দুই বলের আকর্ষণ সীমা বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। কিন্তু বিজ্ঞান এই দু’ইয়ে আটকে থাকল না। আবিষ্কার হল স্বল্প পাল্লার আরো দুই প্রকার বল। সবল ও দুর্বল নিউক্লিয় বল।

সবল নিউক্লিয় বল প্রোটন ও নিউট্রনদের নিউক্লিয়াসের মধ্যে শক্তিশালী বন্ধন তৈরি করে আটকে রাখে। আর দুর্বল নিউক্লিয় বল কাজ করে তেজস্ক্রিয় পরমাণুর নিউক্লিয়াসে। এই বল তেজস্ক্রিয় পরমাণুর নিউট্রনকে ভেঙে প্রোটনে পরিণত করে। এই দুই ধরনের বল নিউক্লিয়াসের ব্যাসের সমান বা তারচেয়ে ক্ষুদ্র দৈর্ঘ্য-সীমার মধ্যে কাজ করে। 

এসব ঘটনা চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞান ব্যাখ্যা করতে পারে না। এসব ক্ষেত্রে নিউটনীয় গতিবিদ্যা, তড়িচ্চুম্বকীয় তত্ত্ব ও আপিক্ষতার সূত্রগুলো অচল। তাই পরমাণুর গহীনের খবর জানতে হলে কোয়ান্টাম তত্ত্বে যেতেই হবে। 

বিংশ শতাব্দীর গোড়া কথা। বিজ্ঞানের জগত মোটামুটি নিশ্চিত নিউট্রন ও প্রোটন কণার সমন্বয়েই পরমণুর নিউক্লিয়াস গড়ে উঠেছে। কিন্তু শুধু এটুকু কথায় চিড়ে ভেজেনি। পরমাণুর অন্দরমহলের যে মাইক্রোস্কোপিক জগৎ, তার আমাদের চেনা জগতের জ্ঞান বুদ্ধি দিয়ে পুরোপুরি উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। তাই ম্যাক্স প্লাঙ্ক, আইনস্টাইন, বোর, শ্রোডিংগার, ডি-ব্রগলিদের, হাইজেনবার্গ, পাউলি, ফাইনম্যানের মতো সুক্ষ্মচিন্তাবিদেরা গড়ে তুললেন কোয়ান্টাম মেকানিক্স নামের এক আশ্চর্য জগত। 

তিরেশের দশক। তখন দুর্বল নিউক্লিয় বলের রহস্য সমাধানের জন্যে করার চেষ্টা করেছিলেন ইটালিয়ান পদার্থবিদ এনরিকো ফার্মি। এজন্য কোয়ান্টামের জগতে হাত বাড়িয়েছিলেন তিনি। অনেক খেটেখুটে দাঁড় করিয়েছিনে গাণিতিক খসড়া। খসড়া মোটামুটি গ্রহণযোগ্য এবং সহজবোধ্য ছিল। কিন্তু ত্রুটিও ছিল তাতে। মূলকণিকাগুলো গতিশক্তি কম হলে ফার্মির তত্ত্বে কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু যেসব মূলকণিকা অনেক বেশি গতিশক্তি নিয়ে ছোটে, ফার্মি-তত্ত্বে গ-গোল লেগে যায় তখন। 

পরের বিশ বছরে কোয়ান্টাম মেকানিক্সে এলো বৈপ্লবিক গতি। তড়িচ্চুম্বকীয় প্রক্রিয়ায় কোয়ান্টাম তত্ত্ব মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে গেল। আবার উচ্চগতিশক্তির কণাদের ক্ষেত্রেও কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সফল প্রয়োগ সম্ভব হলো। এর মধ্য দিয়েই জন্ম হলো ‘কোয়ান্টাম ইলেক্ট্রডাইনামিক্সের’। অর্থাৎ সবল নিউক্লিয় বলের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল কোয়ান্টাম মেকানিক্স।  

সবল নিউক্লিয় বলের জন্য কোয়ান্টাম তো প্রতিষ্ঠিত হলো, তাহলে দুর্বল নিউক্লিয় বলের জন্য কেন নয়? এই চিন্তা-ভাবনা যখন চলছে তখন আবিষ্কৃত হলো দুর্বল বলের এক আশ্চর্য ধর্ম। তা হল, দুর্বল প্রক্রিয়ায় মূল কণিকার স্পিনিং ধর্ম ডান-বাঁমের সাম্যবস্থায় থাকে না।

বিষয়টা আরেকটু খোলসা করে বলা যাক। আগেই বলা হয়েছে, দুর্বল নিউক্লিয় বলের প্রভাবে তেজস্ক্রিয় পদার্থ থেকে বিটা রশ্মির আদলে ইলেকট্রন বেরিয়ে আসে। একটা বিষয় জানা ছিল বিজ্ঞানীদের। ইলেক্ট্রন সবসময় নিজে নিজে লাটিমের মতো ঘোরে। একেই ইলেক্ট্রনের কোয়ান্টাম স্পিন বলে। যদিও কোয়ান্টাম মেকানিক্স ঠিক লাটিমের মতো ঘোরার ব্যাপারটা সমর্থন করে না। 

তবুও স্পিন সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়ার জন্য বলা আর কি । যেহেতু ইলেকট্রন ঘোরে তাই এর নিজস্ব ‘কৌণিক ভরবেগ’ থাকে। এই ঘূর্ণন দু’দিকে হতে পারে। ডানহাতি ও বাঁহাতি স্ক্রু নিয়মে। ডানহাতি স্ক্রু নিয়ম হলো, ডান হাতের সাহায্যে স্ক্রু-ড্রাইভার দিয়ে স্ক্রু আটতে গেলে হাতটাকে যে ভাবে ঘোরাতে হবে। আর বাঁহাতি স্ক্রু নিয়ম হলো, বাঁ হাতের সাহায্যে স্ক্রু-ড্রাইভার দিয়ে স্ক্রু আটতে গেলে হাতটাকে যে ভাবে ঘোরাতে হবে। 

বিটা রশ্মির অন্তর্ভুক্ত ইলেকট্রনগুলো পরীক্ষা করে আর্শ্চজনক ফল পেলেন বিজ্ঞানীরা। এই ইলেক্ট্রনগুলোর সবই বাঁহাতি স্ক্রু নিয়মে ঘোরে। সত্যিই অদ্ভুত! এই আবিষ্কার ফার্মির তত্ত্বকে এগিয়ে দিল আরো একধাপ। তবে ফার্মির তত্ত্বে নতুন বিষয়টা যোগ করার দরকার হলো তত্ত্বটার মধ্যে একটা ডান-বামের অসাম্য থাকতে হবে। 

এ কাজে এগিয়ে এলেন চার-চারজন মার্কিন বিজ্ঞানী। জর্জ সুদর্শন, রবার্ট মার্শাক, মারে গেলমান ও রিচার্ড ফাইনম্যান। এঁদের প্রচেষ্টায় ফার্মির তত্ত্বে আরও সুন্দর কাঠামো পেল। কিন্তু ইলেক্ট্রোডাইনামিক্সের মতো সর্বাঙ্গসুন্দর কোয়ান্টাম তত্ত্ব তখনও পাওয়া যায়নি।  

ধরা যাক, দুটো ইলেকট্রন ছুটে পরস্পরের কাছাকাছি এলো। কিন্তু তাদের মধ্যে পারস্পরিক বিকর্ষণের ফলে আবার ছিটকে দু’দিকে চলে গেল। এরকম ঘটনা কী হারে ঘটতে পারে? ইলেকট্রনগুলির কোনও বিশেষ দিকে ছিটকে যাওয়ার সম্ভাবনা কী রকম? অঙ্ক কষে এগুলোর উত্তর বের করতে গেলে ফল আসবে ‘অসীম’! ইলেকট্রন ছিটকে যাওয়ার হার বের করতে গেলে সেরকমই হওয়ার আশঙ্কা থাকে। 

কোয়ন্টাম ইলেক্ট্রোডাইনামিক্স এই আশঙ্কা দূর করে। এর কতগুলো গাণিতিক বৈশিষ্ট্যও আছে, যার ফলে ওই জাতীয় উদ্ভট পরিণাম সব সময়েই এড়ানো যায়। তাই স্বাভাবিকভাবেই বিজ্ঞানীরা দুর্বল নিউক্লিয় বলকেও একই রকম গাণিতিক ছাঁচে ফেলতে চাইলেন।

আমেরিকান পদার্থবিদ শেলডন গ্ল্যাশো প্রথম এধরনের একটা গাণিতিক কাঠামো প্রস্তাব করালেন। ৬০-এর দশকে। কিন্তু সেই কাঠামোকে সম্পূর্ণ চেহারা দিতে লেগে গেল বেশ কয়েক বছর। শেষ পর্যন্ত আবদুস সালাম ও স্টিফেন ওয়াইনবার্গ এই দুজনের হাত দিয়ে  সেই তত্ত্বের সম্পূর্ণ চেহারাটা বেরিয়ে এল। 

সত্তর দশকের শুরুর দিকে দুই ডাচ বিজ্ঞানী জি টি হুফ ও এম ভেল্টম্যান নামের দু’জন বিজ্ঞানী প্রমাণ করলেন যে, তত্ত্বটার গাণিতিক গঠন অভ্রান্ত। 
সূত্র : বাংলামেইল২৪

Post a Comment