দুর্দশাগ্রস্ত শিশুদের পাশে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন চিকিৎসক


আন্তর্জাতিক দুর্দশাগ্রস্ত শিশু সংস্থা ডিস্ট্রেসড চিল্ড্রেন অ্যান্ড ইনফ্যান্টস (ডিসিআই) এর প্রতিষ্ঠাতা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী চিকিৎসক ড. এহসান হক। যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাটের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৩ সালের ২৪ মে ডিস্ট্রেসড চিল্ড্রেন অ্যান্ড ইনফ্যান্টস (ডিসিআই) প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। ডিসিআই যাত্রা শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের দুর্দশাগ্রস্ত শিশুদের চিকিৎসা, লেখাপড়া ও কর্মসংস্থান তৈরিতে বিভিন্ন ধরনের কাজ করছে সংগঠনটি। 

এর পেছনে রয়েছে ডিসিআই’র প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক ড. এহসান হকের দীর্ঘদিনের কঠোর পরিশ্রম। বাংলাদেশে জন্ম হওয়ায় নিজেকে অত্যন্ত সৌভাগ্যবান মনে করেন এই চিকিৎসক। একেবারে বাল্যকালে চোখের ছানিপড়া রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি। মাত্র তিন বছর বয়সে তার চোখে সাতবার অস্ত্রপচার করা হয়। এ অবস্থাতেই তিনি চিকিৎসক হিসেবে ডিগ্রী নিতে জাপান ও কানাডায় যান। সেখান থেকে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। নিজের জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে তিনি গড়ে তোলেন ওই প্রতিষ্ঠান।

বাংলাদেশের অবহেলিত, অপুষ্টিতে ভোগা, অন্ধ, ঠোঁটকাটা ও অসুস্থ শিশুদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসীদের ১৫ ডলার মাসিক সহযোগিতার মাধ্যমে দেশের হাজার হাজার শিশু-কিশোরকে স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে তার ওই সংস্থা। 

কানেকটিকাট প্রবাসী এই চিকিৎসক যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যাভেন রেজিস্টার নিউজকে বলেন, আমার পুরো জীবনটাই বোনাস, অনেক বছর ধরে জানি যে, আমি সৌভাগ্যবান। এসময় তিনি বাংলাদেশে অত্যন্ত নিম্নমানের স্যানিটেশন ব্যবস্থার কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, প্রতিদিন সকালে আমি এক গ্লাস পানি পেতাম এবং আমি নিজেকে অনেক সৌভাগ্যবান মনে করি। 

এহসান হকের প্রতিষ্ঠিত ডিসিআই বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও নিকারাগুয়ায় দুর্দশাগ্রস্ত অন্তত ৩৩ হাজার শিশুকে সহায়তা করেছে, তবে শুধুমাত্র  উন্নয়নশীল দেশে যে এই সহায়তা করা হচ্ছে তা নয়; তিনি বলেন, ইয়েলের নিউ হ্যাভেনের চেশায়ারেও আমরা শিশুদেরকে সহায়তা করেছি।

এহসান হক বলেন, আমাদের ফ্লাগশিপ প্রোগ্রাম নামে একটি কর্মসূচী আছে। এ প্রোগ্রামের সঙ্গে প্রায় দুই শ’ শিশু কাজ করে। স্কাইপি অথবা ডিসিআই’র ওয়েবসাইটের মাধ্যমে শিশুর সঙ্গে শিশুকে সম্পর্কিত করাই আমাদের এই প্রোগ্রামের উদ্দেশ্য। এর মাধ্যমে প্রত্যেক শিশুর বই ও অন্যান্য শিক্ষাসামগ্রীর ব্যয়ভার হিসেবে মাসে ১৫ মার্কিন ডলার সহায়তা দেওয়া হয়। তিনি বলেন, কর্মে জড়িয়ে পড়া শিশুরা যখন স্কুলমুখী হয়, তখন তাদের বাবা-মার সঙ্গে আমরা একটি লিখিত চুক্তি করি। 

মার্কিন শিশুরাও এর মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছে। কীভাবে আয় করা যায় এবং একটি অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে হয় তা এর মাধ্যমে শিশুরা শিখছে। আমরা শুধুমাত্র দুই দেশের শিশুদের সাহায্য করি না; ভবিষ্যতের নেতা নেতাও তৈরি করছি, বলেন তিনি। 

‘মার্কিন শিশুরা তাদের জীবনকে শ্রদ্ধা করে না, এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। আমাদের এমন একটি জেনারেশন তৈরি করা প্রয়োজন, যারা দেশকে পরবর্তী স্তরে নিয়ে যাবে’। 

শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে এহসান হক প্রথমে বাংলাদেশে প্রশিক্ষণ নেন। বলেন, সহায়তার দর্শন নিয়ে আমি মেডিকেলে গিয়েছিলাম, আমি প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকায় যেতে চাই। আরো বড় পরিসরে কাজের জন্য বাংলাদেশে একটি বেসরকারি সংস্থার স্বাক্ষাৎকারে অংশ নেন তিনি। কিন্তু চোখের সমস্যা তার চাকরির জন্য প্রতিবন্ধকতা উল্লেখ করে স্বাক্ষাৎকারগ্রহীতারা তাকে নিয়োগ দেননি। তিনি বলেন, ‘এটি ছিল আমার জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। পরে আমি বুঝতে পারি ব্যাপক পরিসরে মানুষকে সহায়তার জন্য আমাকে আরো কিছু করা প্রয়োজন’। এজন্য চিকিৎসক হিসেবে ডিগ্রী নিতে জাপান ও কানাডায় যান তিনি। সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে ২০০৩ সালে ডিসিআই প্রতিষ্ঠা করেন।    

ডিসিআই’র প্রেসিডেন্ট ড. ব্রায়েন ডিব্রোফ বলেন, ‘শুধুমাত্র এ কারণেই তিনি একজন অবিশ্বাস্য ডেডিকেটেড ব্যক্তি। তার জীবনের বড় একটি অংশ উৎসর্গ করেছেন তিনি। কঠোর পরিশ্রম করেছেন। আমি জানি না, তিনি কখনো ঘুমান কিনা। কারণ তিনি অন্তত ১৪ ঘণ্টা বাংলাদেশে ডিসিআইর প্রতিনিধিদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন’। 

যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেক দেশেই এখন এই সংগঠনের কার্যক্রম চলছে। সংগঠনের প্রায় সব কাজ পরিচালিত হয় স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে। এহসান হকের মেয়ে নিনা হক প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর হিসেবে কাজ করছেন। 
সূত্র : জাগোনিউজ২৪

Post a Comment