স্পর্শকাতর প্রকল্পে বড় দুর্নীতি


বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানির (বিএসসিসিএল) একটি প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের নকশা প্রণয়ন, নির্মাণ কাজে দুর্বলতা, কার্যক্রম তদারকিতে অবহেলা ও ঠিকাদারের বিল প্রদানে বিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। কুয়াকাটায় দেশের দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবলের ল্যান্ডিং স্টেশন সীমানা প্রাচীর নির্মাণে এসব অনিয়ম হয়েছে বলে প্রমাণ পেয়েছে মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি। 

তদন্তে এসব অনিময়মের জন্য ঠিকাদার, পরার্শক প্রতিষ্ঠান ও বিএসসিসিএল কর্তৃপক্ষকে দায়ী করেছে কমিটি।

সূত্র জানায়, প্রকল্পের প্রায় ৬৫০ কোটি টাকার মধ্যে ইত্যেমধ্যে প্রায় ৪শ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। কিন্তু সে অনুযায়ী কাজ হয়নি। এই অর্থ ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে তদন্ত কমিটি।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘সাবমেরিন ক্যাবলের ল্যান্ডিং স্টেশনের মতো দেশের গুরুত্বপূর্ণ (কেপিআই) স্থাপনার নিরাপত্তা বিধান নিশ্চিতকরণে বিষয়টি অনুধাবনে (সীমানা প্রাচীরের দরপ্রস্তাব ও নকশা প্রণয়নে) বিএসসিসিএল এর নিযুক্ত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এবং বিএসসিসিএল কর্তৃপক্ষ তথা এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক অদূরদর্শিতা ও অযোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন।’

এজন্য বিএসসিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মনোয়ার হোসেন ও প্রকল্প পরিচালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। ইতিমধ্যে মনোয়ার হোসেনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মনোয়ার হোসেন গত ২৪ মার্চ এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘ধসে পড়া প্রাচীর আবার নির্মাণ করা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে সব নিয়ম মানা হয়েছে।’

তদন্ত কমিটির সদস্য ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের উপ সচিব শেখ রিয়াজ বলেন, ‘আমরা তদন্ত রিপোর্ট জমা দিয়েছি। বাকিটুকু ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দেখবে।’

জানার জন্য টেলিযোগাযোগ সচিব ও বিএসসিসিএল এর পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ফয়জুর রহমান চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করেও সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম গতকাল রোববার বাংলামেইলকে বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদন এখনো আমার কাছে এসে পৌঁছেনি। তবে অনিয়ম-দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে কার্পণ্য হবে না।’

সূত্র জানায়, পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়ার আমখোলা পাড়ায় ৬৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশন নির্মাণ করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের সীমানা প্রাচীরের নির্মাণ কাজ ২০১৪ সালের ২১ এপ্রিল শুরু হয়ে ওই বছরের ৩০ নভেম্বর  শেষ হওয়ার কথা । ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কে. কে. এন্টারপ্রাইজ। কিন্তু সময় মতো কাজ শেষ হয়নি।  হস্তান্তরের আগেই ২০১৫ সালের ৮ অক্টোবর প্রবল বৃষ্টিপাতের ফলে প্রায় তিন’শ ফুট প্রাচীর ধসে পড়ে। 

এরপর ঘটনার তদন্তে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের যুগ্ম সচিব ওসমান গণি তালুকদারকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।  কমিটির সদস্য ছিলেন, একই বিভাগের উপ সচিব শেখ রিয়াজ ও গণপূর্ত বিভাগের একজন নির্বাহী প্রকৌশলী। কমিটি ইতিমধ্যে সচিবের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করেছেন।

সূত্র জানিয়েছে, এই প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রকল্প পরিচালকের (সাবেক) সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের এমডির সমন্বয় ছিল না। প্রকল্প পরিচালককে এড়িয়ে এমডি সরাসরি প্রকল্পের বেশিরভাগ অর্থ খরচ করেছেন। সমন্বয় না থাকায় এমডি প্রথম প্রকল্প পরিচালক (পিডি) জাহাঙ্গীর হোসেনকে প্রত্যাহার করে নতুন পিডি হিসাবে পারভেজ মনন আশরাফকে নিয়োগ দেন।

এ বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের আর্থিক ও বাস্তবায়ন সংক্রান্ত  সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সরাকারি বিধি অনুসারে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছ থেকে প্রকল্প পরিচালকের  কাছে হস্তান্তর করা প্রয়োজন।

প্রাচীর ধসে পড়ার কারণ হিসেবে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকল্পের দেয়ালের নকশায় পাইলিংয়ে ‘পাইলিং ক্যাপ’ (যা প্রাচীরের সার্বিক ভর বহন করার কথা) অন্তর্ভূক্ত ছিল না।  এছাড়া প্রাচীরের ভিতরে নকশা বহির্ভূতভাবে শ্রমিকদের আবাসনের জন্য প্রাচীর বরাবর ২৪০ ফুট দৈর্ঘ্যের স্থাপনা (লেবার শেড) নির্মাণ। স্থাপনার জন্য ৭ ফুট উঁচু করে মাটি ভরাট করা হয়। দুর্ঘটনার দিন বৃষ্টিপাতের ফলে অতিরিক্ত পানি ভরাটকৃত মাটির উপর দিয়ে প্রাচীরের গায়ে প্রবল চাপ সৃষ্টি করে। নিচে পাইলিং ক্যাপ না থাকায় পুরো প্রাচীর গোড়া থেকে ধসে পড়ে। 

অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কে. কে. এন্টারপ্রাইজ প্রকল্পের কাজে নিম্নমানের ইট, বালু, পাথর, সিমেন্ট, রড ব্যবহার করেছে। নকশা বহির্ভূতভাবে লেবার শেড বানিয়ে ঠিকাদার চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। দেয়াল ধসে পড়ার পর আবার তা নির্মাণ করার সময় ঠিকাদার বিএসসিসিএল এর অনুমতি নেয়নি। বরং দ্রুততার সঙ্গে দেয়াল পুনঃনির্মাণ করে ধসে পড়ার পেছনে কারিগরি ত্রুটি অনুসন্ধানের সুযোগ নষ্ট করা হয়েছে। এসব অনিয়মের কথা উল্লেখ করে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে ।

প্রাচীর পুনঃনির্মাণে বর্তমান প্রকল্পপরিচালক ঠিকাদারকে নিষেধ না করে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন বলে কমিটি মনে করে

প্রকল্পের অফিস নিয়ে অনিয়ম হয়েছে বলে মনে করে তদন্ত কমিটি। প্রতিবেদনে হয়েছে, ‘প্রকল্পের অফিস প্রকল্প এলাকার নিকটবর্তী কুয়াকাটা শহরে অথবা কলাপাড়া উপজেলা শহরে স্থাপন না করে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে পটুয়াখালী শহরে স্থাপন করা হয়।’ এতে নির্মাণ কাজ তদারকিতে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করেছে কমিটি । কারণ এ দূরত্ব পাড়ি দিতে তিনটি ফেরি পারাপার হতে হয়। তদারকির সমস্যার সঙ্গে সঙ্গে অফিসের জন্য বাড়ি ভাড়া বাবদ অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হয়েছে। এ অনিয়মের বিষয়ে কমিটি পরোক্ষভাবে এমডিকে দায়ী করেছে। কারণ প্রকল্প অফিস স্থাপনে তার ভূমিকা ছিল।

নির্মাণকলে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ও ঠিকাদারের কার্যাবলী তদারকির সার্বিক দায়িত্ব ছিল প্রকল্প পরিচালকের (যার সময় দুর্ঘটনা ঘটে)। কিন্তু তদন্ত কমিটির কাছে মনে হয়েছে, প্রকল্প এলাকা ও প্রকল্প অফিসের মধ্যবর্তী দূরত্ব ও যাতায়াত দুর্গমতার ব্যবস্থার অজুহাতে প্রকল্প পরিচালক সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেনি। এ বিষয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকল্প পরিচালককে সর্তকও করেছিল বলে তদন্ত কমিটি তাদের রিপোর্টে  উল্লেখ করেছে। দায়িত্বে অবহেলার কারণে সাবেক প্রকল্প পরিচালকের  বিরুদ্ধে বিধি অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত বলে মনে করছে তদন্ত কমিটি।

এদিকে নানা অনিয়ম করলেও ঠিকাদারের বিল ঠিকমতো দিয়ে দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকল্পের মান যাচাইয়ের জন্য প্রাথমিক যাচাই কমিটি (প্রোভিশনাল অ্যাকসেপ্টেন্স টেস্ট- প্যাট) ও চূড়ান্ত যাচাই কমিটি (ফাইনাল অ্যাকসেপ্টেন্স টেস্ট- ফ্যাট) গঠন না করেই শুধু পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মতামতের ভিত্তিতে ঠিকাদারকে ‘সময়মতো  ও সন্তোষজনক’ কাজ সম্পাদনের সনদ দিয়েছেন।’

এর মাধমে তিনি সরকারের ক্রয় সংক্রান্ত বিধিমালা ২০০৮ লংঘন করেছেন বলে কমিটি অভিমত দেয়। এ বিধিমালার ২৯ বিধির ৩০ উপবিধি অনুসারে ঠিকাদারকে এ ধরনের সনদ দিবে প্রকল্প পরিচালক। তদন্ত কমিটি মনে করে, প্যাট ও ফ্যাট কমিটির মাধ্যমে যচাই করা হলে নির্মাণকাজের ত্রুটি ধরা পড়ত। এছাড়া যথাযথ নিয়ম মেনে কাজ সম্পন্ন করলে ঠিকাদারের বিল প্রদানেও স্বচ্ছতা প্রদর্শিত হতো। উপরোল্লেখিত প্রকল্পের সময় এর ব্যত্যয় ঘটেছে।

এদিকে মন্ত্রণালয় তদন্ত কমিটি গঠন করার পরও বিএসসিসিএল এমডি নিজ  উদ্যোগে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে তদন্ত কাজ পরিচলনার জন্য একটি কমিটি গঠন করেন। পরে মন্ত্রণালয় আপত্তি জনালে তিনি বুয়েটের কমিটি বাতিল করেন। তবে এরমধ্যেই এ কাজে প্রায় দুই লাখ টাকা ব্যয় হয়ে যায়। বিষয়টিকে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের স্বেচ্ছাচারিতা উল্লেখ করে মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি বলেছে, তিনি (এমডি) আর্থিক অব্যবস্থাপনার স্বাক্ষর রেখেছেন।

সরকারের ক্রয়বিধিমালা লঙ্ঘনের কারণে বিএসসিসিএল এমডির বিরুদ্ধে  প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদ কর্তৃক আইনগত ব্যবস্থা নিতে বলেছে তদন্ত কমিটি। মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ সত্ত্বেও নিজ উদ্যোগে তদন্ত কমিটি গঠন ও অর্থ ব্যয়ের জন্য জবাবদিহিতা চাওয়া প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের নকশা ত্রুটিপূর্ণ ছিল বলে জানিয়েছে কমিটি। চুক্তির ১.২ ধারা অনুসারে প্রকল্প এলাকায় সব সময় একজন বিএসসি প্রকৌশলীর (সিভিল) অবস্থান করার কথা থাকলেও তা মানেনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। চুক্তির নানান শর্ত লঙ্ঘন করায় পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে স্বাক্ষরিক চুক্তির আলোকে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য পরামর্শ দিয়েছে তদন্ত কমিটি।
সূত্র : বাংলামেইল২৪

Post a Comment