‘মরিনি, বেঁচে আছি মা’

‘মা, তুমি কী শুনতে পাচ্ছো। আজ আমার বয়স এক মাস হয়ে গেছে। তোমার কি সে দিনটির কথা মনে আছে? রাতের বেলা মাইক্রোবাসে করে পরীবাগের ফুটপাতে ফেলে গিয়েছিলে। তখন আমার ওজন ছিল মাত্র ২ কেজি। তীব্র পানিশূন্যতায় ডায়রিয়ার পাশাপাশি শ্বাসকষ্টে হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছিল। আপু-ভাইয়ারা আমাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে এসেছিল। তোমরা ছেড়ে গেলেও ডাক্তার, নার্স, আপু ও ভাইয়াদের চিকিৎসাসেবায় আমি এখনো মরিনি, বেঁচে আছি মা।’ 

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আনুমানিক আড়াই মাস বয়সী শিশু আল-মামুন মুখ ফুটে কথা বলতে পারলে হয়তো এভাবেই মায়ের প্রতি অভিমান করে তাকে ফেলা যাওয়া ও মৃত্যুমুখ থেকে বেঁচে থাকার কথাগুলো বলতো। 

বলছিলাম, রাজধানীর পরীবাগের সেই পরিত্যক্ত ছোট্ট শিশু মামুনের কথা। দীর্ঘ একমাস ঢামেক হাসপাতালের নবজাতক বিভাগের চিকিৎসকদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় মুমূর্ষু মামুন প্রায় সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছে। হাসপাতালে থাকার আর প্রয়োজন না থাকায় সোমবার কর্তৃপক্ষ তাকে সমাজসেবা অধিদফতরের মাধ্যমে আজিমপুর শিশুমণি নিবাসের কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করেছে। 

হাসপাতাল পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল মিজানুর রহমান ও নবজাতক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা আল-মামুনকে শিশুমণি নিবাসের উপ-তত্ত্বাবধায়ক বিলকিস আক্তারের কাছে হস্তান্তর করেন। এ সময় সহকারী পরিচালক ডা. খাজা আবদুল গফুর, নবজাতক বিভাগের চিকিৎসক, নার্স, সমাজসেবা অধিদফতরের কর্মকর্তা ও শিশুটিকে উদ্ধার করে যারা হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল তারা উপস্থিত ছিলেন।

হাসপাতাল পরিচালক জানান, গত ১১ মার্চ সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া কিছু ছেলেমেয়ে পরিত্যক্ত শিশুটিকে হাসপাতালে ভর্তি করে। ভর্তির সময় শিশুটির শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। ওজন কম, ডায়রিয়া ও তীব্র শ্বাসকষ্ট ছিল। মাসাধিক কাল হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দেয়ায় সে এখন প্রায় সুস্থ।
ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা জানান, শিশুটির এখন হাসপাতালে থেকে চিকিৎসা নেয়ার প্রয়োজন নেই। এখন তার নিয়মিত খাবার-দাবার, ওষুধপত্র ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশে থাকা দরকার। সে জন্যই তাকে শিশুমণি নিবাসে পাঠানো হচ্ছে। 

তিনি জানান, চিকিৎসক নার্সদের পাশপাশি যারা তাকে উদ্ধার করে এনেছিল তারা নিয়মিত খোঁজ-খবর নিয়েছে। ভর্তির সময় শিশুটির বয়স আনুমানিক দেড় মাস থাকলেও তাকে দেখে কয়েকদিনের নবজাতক মনে হচ্ছিল। হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সরা তার নাম আল-মামুন রাখেন।

পরীবাগের ‘হাসিমুখ’ স্কুলের অনিক, জুলকার নাইন, আলফি, মিলন ও জুবাইদা জাগো নিউজকে জানান, ওই এলাকার তাছলিমা নামের একজন নারী প্রথমে শিশুটিকে মাইক্রোবাস থেকে ফুটপাতে ফেলে রাখার বিষয়ে তাদের খবর দেয়। তারা গিয়ে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। শিশুটি ফেলে যাওয়ার সময় তার পাশে কিছু ওষুধপত্রও রাখা ছিল বলেও জানান তারা। 

জানা গেছে, তাসলিমা নামের ওই নারী আল-মামুনকে নিতে চাইলেও আপাতত তাকে দেয়া হয়নি। 

সহকারী পরিচালক খাজা আবদুল গফুর জানান, তাছলিমা নিজেও আংশিক প্রতিবন্ধী। তার একটি বাচ্চাও প্রতিবন্ধী। তাই তার কাছ দেয়া হয়নি। 

হাসপাতাল পরিচালক জানান, কেউ চাইলে সমাজসেবা অধিদফতরে যোগাযোগ করে নিয়মতান্ত্রিকভাবে তাকে লালন-পালনের জন্য নিতে পারবেন। 
সূত্র : জাগোনিউজ২৪

Post a Comment