নিয়মনীতি নয় বাড়িভাড়া বাড়ে মালিকের ইচ্ছায়


দেড় কোটি মানুষের বাস রাজধানী ঢাকায়।  তবুও জীবিকার তাগিদে এই নগরীকেই বেছে নিচ্ছেন সবাই। তাই প্রতিদিনই এ সংখ্যা বাড়ছে। ফলে বাইরে থেকে আসা মানুষের একমাত্র আশ্রয়স্থল ভাড়াবাসা। আর এ সুযোগে কোনো প্রকার নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে বাড়ির মালিকরা ভাড়ার বাড়তি বোঝা চাপিয়ে দেন ভাড়াটিয়াদের কাঁধে। সরকারের নিয়ম ও নির্দেশ অমান্য করে ইচ্ছা মতো ভাড়া আদায়ের চাপে দিশেহারা ভাড়াটিয়ারা।

এছাড়া বাড়ির ভাড়া কেমন হবে, কখন ভাড়া বাড়বে, ভাড়াটিয়াকে কখন উচ্ছেদ করা যাবে, অগ্রিম জামানত গ্রহণ, ভাড়া আদায়ের রশিদ প্রদান, লিখিত চুক্তি, বাড়ি মেরামত ও বসবাস যোগ্য কিনা- বিষয়গুলো নিয়ে কোনো ধরণের আইনে তোয়াক্কা করেন না বাড়ির মালিকরা। 

অন্যদিকে, বেশির ভাগ ভাড়াটিয়া বিষয়গুলো না জানায় সব অনিয়ম মুখ বুজে সহ্য করেন।

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) এর তথ্য মতে, ঢাকায় গত ২৪ বছরে (১৯৯০-২০১৩) বাসাভাড়া বেড়েছে প্রায় ৩৭২ শতাংশ। সর্বশেষ ২০১২ সালে ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ ও ২০১৩ সালে ১০ দশমিক ৯১ শতাংশ ভাড়া বেড়েছে।

সূত্রে জানা যায়, সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক গুলশান এলাকার প্রতি বর্গফুট বাড়িভাড়া ১৫ থেকে ১৮ টাকা, বনানীতে ১৪ থেকে ১৬, মহাখালীতে ১১ থেকে ১২, নাখালপাড়াতে ৬ থেকে ৭, কল্যাণপুর-পল্লবীতে ৬ টাকা, উত্তরায় ৫ থেকে ৯ টাকা, শান্তিবাগে ৫ থেকে ৬ টাকা, নয়াপল্টনে ৯ টাকা, শান্তিনগরে ৮ থেকে ৯ টাকা, জিগাতলায় ৮ টাকা ও ধানমন্ডিতে ১১ দশমিক ২৫ টাকা নির্ধারিত রয়েছে। কিন্তু বাড়ির মালিকরা ভাড়া আদায় করছেন এর দ্বিগুণ থেকে তিনগুণেরও বেশি।

হাইকোর্টের নির্দেশ উপেক্ষিত
২০১৫ সালের ১ জুলাই এক নির্দেশে বাড়িভাড়া নির্ধারণ এবং বাড়িভাড়া সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির একটি ‘উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন’ কমিশন গঠনের জন্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। আদালতের এই নির্দেশে জিম্মিদশায় থাকা ভাড়াটিয়াদের মনে আশার সঞ্চার করেছিল। কিন্তু হাইকোর্টের ওই আদেশের পর ৬ মাসের বেশি সময় পার হলেও নির্দেশ বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট দফতরের কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয়নি।

বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন হালনাগাদ ও কার্যকরের দাবি নিয়ে উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হয়েছিল একটি বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন। হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ’ নামে সংগঠনের ২০১০ সালে করা রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে ১৭ মে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ-সংক্রান্ত আইন ও বিধিবিধান কার্যকর করতে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট।

মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করে ২০১৫ সালের ১ জুলাই রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ে বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে কথা বলে তাদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার পাশাপাশি এলাকাভেদে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ ভাড়া নির্ধারণের জন্য সরকারকে ৬ মাসের মধ্যে একটি ‘উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন’ কমিশন গঠনের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

হাইকোর্টের রায়ের বিষয়ে অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ জাগো নিউজকে বলেন, সাত সদস্যের এ কমিশনের প্রধান হবেন আইন মন্ত্রণালয়ের মনোনীত একজন আইনজীবী। কমিশনে অন্তর্ভুক্ত থাকবেন গৃহায়ণ ও নগর বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, ভোক্তা অধিকার ও নাগরিক স্বার্থ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ এবং সরকার মনোনীত সিটি কর্পোরেশন কর্মকর্তা। ওই কমিশন ভাড়াটিয়া এবং বাড়ির মালিকদের মতামত শুনে, প্রয়োজনে গণশুনানির মাধ্যমে এলাকাভিত্তিক সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন ভাড়া নির্ধারণ করবেন।

পাশাপাশি ভাড়াটিয়া-মালিকদের বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে প্রতিকারের সুপারিশ করার এবং ভাড়াটিয়াদের জিম্মিদশার অবসান ও বাড়িভাড়া সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা তৈরির পথ নির্দেশ করছে এই রায়।

রায়ে কমিশনের সুপারিশ আইনি কাঠামোর রুপ না পাওয়া পর্যন্ত ১৯৯১ সালের বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের ৩ ধারা অনুযায়ী প্রতিটি ওয়ার্ডে বাড়িভাড়া সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একজন করে নিয়ন্ত্রক, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রক ও উপনিয়ন্ত্রক নিয়োগের উদ্যোগ নিতেও বলা হয়েছে।

মনজিল মোরসেদ আরো বলেন, কমিশনের সুপারিশ আইনি কাঠামোতে আসার আগ পর্যন্ত কোনো ভাড়াটিয়াকে যাতে উচ্ছেদ বা ভয়ভীতি দেখানো না হয়, কারও কোনো অভিযোগ থাকলে তা যাতে দ্রুত মেটানো হয় এবং প্রয়োজনে তাদের সুরক্ষার ব্যবস্থা যাতে নেয়া হয়, তা নিশ্চিত করতে সব থানার ওসিদের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। কিন্তু এ বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি।

৮০ ভাগ ভাড়াটিয়া ১৫ ভাগ বাড়ির মালিকের কাছে জিম্মি
বিভিন্ন জরিপ সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীতে বসবাসকারীদের মধ্যে ৮০ ভাগেরও বেশি মানুষ ভাড়া বাসায় থাকেন। বাড়িভাড়ার হিসেব মিলিয়েই তাদের জীবন সংগ্রামে লিপ্ত হতে হয়। অর্থাৎ ১৫ ভাগ বাড়িওয়ালাদের কাছে নগরীর কোটি মানুষ অসহায়। বছরের পর বছর ধরে বাড়িভাড়া বাড়ার ফলে ভাড়াটিয়াদের দুর্গতির যেন শেষ নেই।

সম্প্রতি এক জরিপে জানা যায়, রাজধানী ঢাকায় বসবাসকারীদের উপার্জনের ৬০ ভাগ ব্যয় হয় বাড়িভাড়ায়। বাকি ৪০ ভাগ দিয়ে কোনো রকমে জীবিকা নির্বাহ করতে হয় তাদের।

তবে অন্য এক জরিপে জানা যায়, রাজধানীতে বসবাসরত ভাড়াটিয়াদের ৫৫ ভাগ বাসার ভাড়া ও আয়তন সম্পর্কে জানেন না। ফলে বাড়িভাড়ার ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে আরো সক্রিয় হওয়া উচিত বলে মনে করছেন ভাড়াটিয়ারা।

সূত্র : জাগোনিউজ২৪

Post a Comment