ভেজাল ও বিষাক্ত খাদ্যে সয়লাব ঝালকাঠি


ঝালকাঠির ২টি পৌরসভা এবং ৪টি উপজেলায় রয়েছে সহস্রাধিক খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, আইসক্রিম ফ্যাক্টরি, হোটেল ও রেস্তোরাঁ। এসব কারখানাগুলোর পরিবেশ রয়েছে স্যাঁতসেঁতে এবং কর্মচারীরা কাজ করছেন উদম শরীরে। কর্মচারীদের শরীরের ঘাম পড়ছে তৈরিকৃত খাবারে। কিন্তু সেদিকে নজর নেই কর্তৃপক্ষের। 

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভেজাল ও বিষাক্ত খাদ্যের কাছে জিম্মি এখন জেলার ৪ উপজেলার সকল শ্রেণির মানুষ। বাজারজাত হওয়া বেশির ভাগ খাদ্য পণ্যই ভেজাল এবং সেসব খাদ্য পণ্য দেহের জন্য চরম ক্ষতিকর। অপরদিকে স্যাঁতসেঁতে, নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি করা খাদ্যদ্রব্য বাজারে বিক্রি হচ্ছে দেদারছে। 

ঝালকাঠি পৌর এলাকায় খাদ্য উৎপাদনকারী বেকারি, চানাচুর, মোয়া ও অন্যান্য কারখানা রয়েছে ২৮টি। আইসক্রিম ফ্যাক্টরি রয়েছে ৬টি এবং হোটেল, রেস্তোরাঁ রয়েছে ৬০টি। সদর উপজেলায় বেকারির পণ্য তৈরির কারখানা রয়েছে ১১টি এবং আইসক্রিম তৈরির কারখানা রয়েছে ২টি এবং চানাচুর ও অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য তৈরির কারখানা রয়েছে ৫টি। হোটেল রেস্তোরাঁ রয়েছে অসংখ্য। 

নলছিটি পৌর এলাকায় বেকারি পণ্য উৎপাদনের কারখানা রয়েছে ২টি এবং আইসক্রিম তৈরির কারখানাও রয়েছে ২টি। এছাড়া হোটেল, রেস্তোরাঁর সংখ্যাও রয়েছে অনেক। 

নলছিটি উপজেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টর সৈয়দা মহফুজা বেগমের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করে না পাওয়ায় উপজেলার কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তবে অভিযোগ রয়েছে, মাহফুজা বেগম মাঠে কোনো কাজ না করেই নিয়মিত সরকারি বেতন ভাতা উত্তোলন করছেন। উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সমন্বয় সভায় তিনি কখনোই উপস্থিত থাকেন না। 

রাজাপুর উপজেলায় বেকারি পণ্য উৎপাদনের কারখানা রয়েছে ১১টি এবং আইসক্রিম তৈরির কারখানাও রয়েছে ৪টি। এছাড়া হোটেল, রেস্তোরাঁ রয়েছে অসংখ্য। কাঠালিয়া উপজেলায় বেকারির সংখ্যা রয়েছে ৫টি এবং আইসক্রিম তৈরির কারখানা রয়েছে ২টি।  পৌর এবং উপজেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টরদের কাছ থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। 

তবে জেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টর আ. রব বলেন, আমার কাছে এদের কোনো তথ্যই নেই। উপজেলা ও পৌর স্যানিটারি ইন্সপেক্টরদের মোবাইল নম্বর নিয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্য জানতে পারেন। 

ঝালকাঠির পূর্ব চাঁদকাঠির রিংকু বেকারিতে ঢুকে দেখা গেছে, খালি হাতে, উদম শরীরে কাজ করছেন কর্মচারীরা। শুকানোর জন্য রাখা রুটির উপরে রয়েছে ভেজা প্যান্ট। যার পানি ফোটায় ফোটায় রুটির উপর পড়ছে। 

কর্মচারী রিপন ও ইলিয়াছ বলেন, আমরা যখন কাজ করি তখন হাতে গ্লোবস লাগাই না। প্রধান মিস্ত্রি যখন মসলা মিশান তখন গ্লোবস লাগান। উদম শরীরে কেন জিজ্ঞাসা করলে তারা বলে, নিয়মানুযায়ী জামা গায়ে দিয়ে কাজ করার কথা থাকলেও প্রচণ্ড গরমে কি করবো?

কয়েকটি মিষ্টির দোকানে গিয়ে দেখা গেছে, নোংরা ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ। কোনো নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে গুড়া দুধ ও ময়দা মিশিয়ে তৈরি করছে মিষ্টি। সাধনার মোড়স্থ ইতু সুইটস, কালী বাড়ি রোডস্থ মাদারীপুর দধিঘর, গৌরনদী দধিঘর, বারচালার সামনে সকাল-সন্ধ্যা মিষ্টান্ন ভান্ডারের সামনে প্রদর্শনী মিষ্টি জাতীয় খাদ্যপণ্য সুদর্শন ও সুস্বাদু। কারখানার মধ্যের অবস্থা খুবই খারাপ। 

হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোতে প্রতিদিনের উদ্ধৃত্ত খাবার ফ্রিজে রেখে পরের দিনের খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রি করছে। যার দরুণ হোটেলে শুরু থেকে যে সকল খাদ্য পণ্য দিয়ে শুরু হয়, তার ধারাবাহিকতা চলমান  থাকে। এতে করে জটিল ও মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে ভোক্তারা। সুচতুর মালিকগণ ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযোন দেখলেই দোকান বন্ধ করে আত্মগোপন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। 

সচেতন মহলের ধারণা, বাজারে ভেজালমুক্ত খাদ্য সামগ্রী পাওয়াটাই কষ্টকর। ভেজাল বিরোধী অভিযানকালে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটরা প্রায়ই দেখেন, বাজারজাত করা ৭৮ ভাগ খাদ্য সামগ্রী ভেজাল ও বিষাক্ত কেমিক্যালের সংমিশ্রণে তৈরি। ভেজাল খাদ্য খেয়ে প্রতি বছর জেলাবাসীর পেটে পড়ছে কয়েক মণ ফরমালিন। আর ভেজাল খাদ্যে জীবনঘাতী রোগের বিস্তার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এর ফলে ক্যান্সার, চর্মরোগ, আলসার, লিভার ও কিডনি সংশ্লিষ্ট রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতি বছর শুধু ভেজাল খাদ্য পণ্যের কারণেই জেলার কয়েক হাজার মানুষ জটিল রোগে আক্রান্ত হন। আর স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও খাদ্যে ভেজাল মেশানোকে জনস্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে দেখছেন। শুধু ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে বিপুল সংখ্যক লোক ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন। ডায়াবেটিস ও কিডনি রোগে আক্রান্তের সংখ্যাও কয়েক হাজার। এছাড়া অন্তঃসত্ত্বা মায়ের শারীরিক জটিলতাসহ গর্ভজাত বিকলাঙ্গ শিশুর সংখ্যাও কম নয়। 

চিকিৎসকরা বলেন, ভেজাল খাদ্য পণ্য কিনে আমরা শুধু প্রতারিতই হচ্ছি না, মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতেও রয়েছি। ভেজাল পণ্য আমাদের ক্যান্সার, হেপাটাইটিস, কিডনি ও লিভারের জটিল রোগ সৃষ্টির জন্য দায়ী। 

ভেজাল পণ্যের কারবার : 

জেলার ৪ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা খাদ্যদ্রব্য তৈরির প্রতিটি কারখানার পরিবেশের অবস্থা করুণ। প্রতিদিন এসব কারখানায় কয়েক কোটি টাকার ভেজাল খাদ্য বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে, বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে ভেজাল আইসক্রিম তৈরির অসংখ্য কারখানা। এ কারখানায় তৈরি ভেজাল খাদ্য খেয়ে প্রতিনিয়ত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। 

বিএসটিআই এর এক কর্মকর্তার মতে, বাজারে যেসব পাউরুটি-বিস্কুট পাওয়া যায় তার অধিকাংশেই ছত্রাক থাকে। অস্বাস্থ্যকর পদ্ধতিতে তৈরি হয় বলে এসব খাদ্যে কৃমি জাতীয় পরজীবীও থাকে। অনেক ক্ষেত্রে নিম্নমানের হোটেলগুলোর তরকারির রং আকর্ষণীয় করতে জর্দার রং ও নানার কম কেমিক্যাল রং মাত্রাতিরিক্তভাবে ব্যবহার করছে যা স্বাস্থ্যসম্মত নয়। এছাড়া ফুটপাত এবং হোটেলের শরবত ও ঠান্ডা পানিতে মাছের হিমাগারে ব্যবহৃত দূষিত পানি দিয়ে তৈরি বরফ মেশানো হচ্ছে। 

যেভাবে ভেজাল মেশানো হয় : 

জেল-জরিমানা করেও ভেজাল এবং বিষাক্ত খাদ্য সামগ্রীর আগ্রাসন রোধ করা যাচ্ছে না। এমনকি বেশিরভাগ সয়াবিন তেল তৈরি হচ্ছে সাবান তৈরির পাম অয়েল দিয়ে। বেকারি ও মিষ্টিতে ব্যবহার করা হচ্ছে বিষাক্ত রং। চানাচুর ও জিলাপি ভাজা হয় পোড়া মবিল দিয়ে। মুড়ি ভাজা হয় ইউরিয়া সার দিয়ে। মরা মুরগি দিয়ে তৈরি করা হয় চাইনিজ এবং স্যুপ। নানা ধরনের ফলে কেমিক্যাল স্প্রে এখন নিয়মিত ঘটনা। 

এছাড়া বাজারে বিক্রি হওয়া মাছে, দুধে ও ফলমূলে ফরমালিন এবং কার্বাইডসহ নানা বিষাক্ত কেমিক্যাল কৌশলে মেশানোর কাজ চলছেই। সবজিতে রাসায়নিক কীটনাশক, বিস্কুট, আইসক্রিম, কোল্ড ড্রিংকস, জুস, সেমাই, আচার, নুডলস এবং মিষ্টিতে টেঙটাইল ও লেদার রং মেশানো হচ্ছে নির্দ্বিধায়। এছাড়া ক্ষতিকর পদার্থের মধ্যে খাদ্য সামগ্রীতে আরও ব্যবহৃত হচ্ছে স্যাকারিন, মোম, যানবাহনে ব্যবহৃত মবিল, সোডা, আটা-ময়দা, সুগন্ধি, ট্যালকম পাউডার। ভেজাল মসলা উৎপাদনকারীরা গুঁড়া মরিচের সঙ্গে মেশাচ্ছেন ইটের গুঁড়া। হলুদে দেয়া হচ্ছে মোটর ডাল, ধনিয়ায় স`মিলের কাঠের গুঁড়া আর পোস্তাদানায় সুজি। 
সূত্র : জাগোনিউজ২৪

Post a Comment