বদলে যাবে সংসদ এলাকার চিত্র


বিশ্বখ্যাত স্থপতি লুই কানের নতুন ঢাকার পূর্ণাঙ্গ নকশা আগামী জুনেই আসছে বাংলাদেশে। এবার শুধু সংসদ ভবনের পূর্ণাঙ্গ নকশাই নয়, ১৯৬৪ সালে আধুনিক ঢাকা শহর গড়ে তোলার জন্য যে ‘আইয়ুবনগর’ প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল, এর ৮৫৩টি নকশাই পাওয়া গেছে। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে ‘আইয়ুবনগর’-এর নাম পরিবর্তন করে শেরেবাংলানগর রাখা হয়। এর মধ্যে শেরেবাংলানগরের নতুন সচিবালয়সহ পুরো এলাকায় কোথায় কী থাকবে, তার বিস্তারিত নকশা রয়েছে। এসব নকশার মধ্যে রয়েছে ৭৩৮টি পূর্ণ ও ১১৫টি অসম্পূর্ণ নকশা। রাজধানী ঢাকাকে বাসযোগ্য আধুনিক শহর হিসেবে গড়ে তোলার জন্য নতুন সচিবালয় গড়ে তোলার উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সরকার পেয়ে গেছে দুর্লভ স্থাপত্যকর্মের ঐতিহাসিক নগর নকশার এ দলিলপত্র। এ নকশা বাস্তবায়ন করা গেলে বদলে যাবে সংসদ এলাকার চিত্র। সংসদ সচিবালয়, গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, গণপূর্ত অধিদফতরের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেছে এসব তথ্য। এ বিষয়ে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে লুই আই কানের সব নকশা দেশে আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। অতীতের সরকারগুলো স্থপতি লুই আই কানের পারিশ্রমিকও পরিশোধ করেনি। ফলে বকেয়াসহ সব পাওনা পরিশোধ করেই এসব নকশা দেশে আনতে হচ্ছে। এরই মধ্যে সংসদ কমিশন প্রয়োজনীয় ব্যয় অনুমোদন করেছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ব্যয় ছাড়ও করেছে। এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের বৈঠকেও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জানা যায়, চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহেই নকশা আনার জন্য বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধি দলের ঢাকা ছাড়ার কথা থাকলেও সদস্য মনোনয়ন, করণীয় নির্ধারণসহ সরকারি আনুষ্ঠানিকতা ও ভিসা প্রক্রিয়ার কারণে এ ক্ষেত্রে কিছুটা দেরি হয়েছে বলে জানায় স্পিকারের দফতর। তবে এ সপ্তাহেই প্রতিনিধি দলটি ঢাকা ছাড়ছে বলে নিশ্চিত করেছে সংসদ সচিবালয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া সাত সদস্যের এ প্রতিনিধি দলে থাকছেন স্থাপত্য অধিদফতরের তিনজন, এর মধ্যে আর্কিটেক্ট ও সিভিল ইঞ্জিনিয়ারও থাকছেন। এ ছাড়া গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধি, গণপূর্ত অধিদফতরের একজন, পিডব্লিউডির একজন এবং সংসদ সচিবালয়ের একজন প্রতিনিধি দলে থাকছেন। যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে প্রতিনিধি দল নমুনা হিসেবে পাঠানো নকশার সঙ্গে মূল নকশা যাচাই-বাছাই করার পর এর স্থাপত্য ও প্রকৌশলগত খুঁটিনাটি বিষয় জেনে নেবে। এরপর প্রতিনিধি দলের প্রতিবেদন পাওয়ার পর ঢাকা থেকে যাবে টাকা। সবশেষে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের এ নকশা আনতে যাওয়ার একটি পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে বলে জানা গেছে। সংসদ সচিবালয় সূত্র জানান, লুই আই কানের নকশা আনতে পূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবক্রমে সংসদ কমিশন ৪ লাখ ৫৯ হাজার ৮০০ ডলারের একটি ব্যয় প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে নকশা তল্লাশি ফি বাবদ ৩ হাজার ৫৫০ ডলার। এ ছাড়া স্থপতি লুই আই কানের বকেয়া পাওনা পরিশোধসহ পেনসিলভানিয়া ইউনিভার্সিটির ফি, হার্ড কপি ও সফট কপি, নকশার প্রস্তুতির ব্যয় ও কর্মকর্তাদের যুক্তরাষ্ট্র সফরের ব্যয় এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর আগে নকশার খোঁজে তিন দফা যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাসহ গণপূর্ত অধিদফতর ও স্থাপত্য অধিদফতরের তিন কর্মকর্তা। এসব প্রাথমিক সফর বাবদ ৪৬ লাখ টাকা খরচ হয়। এ টাকা জোগান দেওয়া হয় নতুন সচিবালয় প্রকল্পের নকশা খাত থেকে। টাকার অঙ্কে সব মিলিয়ে নকশা আনার ব্যয় দাঁড়ায় ৩ কোটি ৬৭ লাখ ৮৭ হাজার ৬৮০ টাকা। এ সফরের ফলাফল হিসেবে আধুনিক ঢাকা প্রকল্পের ৮৫৩টি নকশার খোঁজ পায় বাংলাদেশ। লুই আই কানের কর্মস্থল যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে পাঠানো এসব নকশা এর মধ্যে যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘নকশা খুঁজে পেতেই আমাদের বেশি বেগ পেতে হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া ইউনিভার্সিটির আর্কাইভে ৮ হাজার নকশার মধ্য থেকে আমাদের নকশাগুলো খুঁজে বের করতে হয়েছে। এ ছাড়া আমাদের ভাগ্য ভালো যে, লুই আই কানের নকশা প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত একজন স্থপতিকেও আমরা খুঁজে পেয়েছি। তিনি এখনো বেঁচে আছেন। তার বয়স এখন ৮৭ বছর। আমরা তার সঙ্গেও যোগাযোগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এবার আমাদের প্রতিনিধি দল ওই স্থপতির সঙ্গে কথা বলবে। আমরা তাকেও বাংলাদেশে আনার চেষ্টা করছি।’ তিনি বলেন, ‘নকশাগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে চার থেকে ছয় সপ্তাহ লেগে যেতে পারে। আশা করছি জুনের মধ্যে নকশাগুলো আমরা হাতে পেয়ে যাব।’ নকশা আনতে বিপুল অর্থের ব্যয় প্রসঙ্গে স্পিকার বলেন, ‘আমরা লুই আই কানের মতো স্থপতির ৮৫৩টি নকশা পাচ্ছি। এর মধ্যে নতুন সচিবালয়ের নকশাও থাকতে পারে। আমরা জানি না। ১১৫টি অসম্পূর্ণ নকশা আছে। এখানে কত টাকা ব্যয় হলো তা কোনো সমস্যা নয়। এ খাতে যত টাকার দরকার হবে তা দেবে সরকার। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ রয়েছে। এ ছাড়া এ বিষয়ে সংসদ কমিশনসহ পরিকল্পনা কমিশনের বৈঠকের সিদ্ধান্তও রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সংসদ ভবন ও শেরেবাংলানগরের মূল নকশা জাতীয় সম্পদ। এসব বাংলাদেশের কাছেই থাকা উচিত। কিন্তু আমরা এতদিন এসবের মালিকানা থেকে বঞ্চিত ছিলাম। এবার আমরা শুধু সংসদ ভবন নয়, নকশার ওপরও আমাদের মালিকানার অধিকার লাভ করতে পারছি। এজন্য বাঙালি জাতিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা ও সঠিক সিদ্ধান্তের প্রশংসা করতেই হবে। এ ছাড়া এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিশ্বে আমাদের মাথা অনেক উঁচু হয়েছে। কারণ এতদিন একটি স্বাধীন দেশ হয়েও আমরা আমাদের দেশের নগর পরিকল্পনাকারীর স্থাপত্য নকশার পরামর্শক ফি না দেওয়ার দোষে আন্তর্জাতিক বিশ্বের কাছে অভিযুক্ত ছিলাম। তিনি এমন এক স্থপতি, যার নকশার কারণে আমাদের সংসদ ভবন বিশ্বের আধুনিক স্থাপত্যশিল্পের এক দৃষ্টিনন্দন নিদর্শন এবং আন্তর্জাতিক হেরিটেজের মর্যাদা পেয়েছে। এসব আমাদের মনে রাখতে হবে।’ স্থাপত্য অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশের কাছে তার পরামর্শক ফির ৬০ হাজার ৯৭৪ ডলার পাওনা ছিল। বার বার তাগাদা দিয়েও তারা বাংলাদেশ থেকে এ টাকা পায়নি। সেজন্যই তারা বকেয়ার সুদসহ নকশার মূল কপির ড্রয়িং ও সফট কপির জন্য ৪ লাখ মার্কিন ডলার দাবি করেছে। কিন্তু আলোচনার মাধ্যমে সুদ মওকুফ করাতে সক্ষম হয়েছে সরকার। জানা যায়, ১৫ মিলিয়ন ডলারের অনুমিত ব্যয় ধরে জাতীয় সংসদ ভবন নির্মাণ ও শেরেবাংলানগর এলাকার বিস্তারিত স্থাপত্য নকশা প্রণয়নের জন্য মার্কিন স্থপতি লুই কানকে নিয়োগ করা হয়। তার নকশা অনুযায়ীই শুরু হয় সংসদ ভবন কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজ। স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর সরকারও অসমাপ্ত এ কাজ অব্যাহত রাখতে লুই কানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ১৯৮২ সালে ৩২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে নির্মাণকাজ শেষ হয়। সরকারি নথির তথ্যানুযায়ী, ১৯৮৩ সালের ২৪ জুলাই পর্যন্ত লুই কানের বকেয়া ফির পরিমাণ ছিল ২ লাখ ১৬ হাজার ৯৬৪ ডলার। তত্কালীন সরকার তার উত্তরাধিকারী ডেভিড উইসডম অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসকে তিন কিস্তিতে এ অর্থ পরিশোধের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে দুই কিস্তির অর্থ ১ লাখ ৫৫ হাজার ৯৯০ ডলার পরিশোধের পর বার বার তাগিদ দিয়েও শেষ কিস্তির ৬০ হাজার ৯৭৪ ডলার আর পরিশোধ করা হয়নি। এদিকে লুই কানের নকশা অনুযায়ী সংসদ ভবন কমপ্লেক্সের মূল নকশা আমলে না নিয়ে ২০০১ সালে জোট সরকারের শাসনামলে চন্দ্রিমা উদ্যানে পাঁচ বিঘা জমির ওপর সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধি কমপ্লেক্স গড়ে তোলা হয়। এ ছাড়া পাশে ১০ একর জমিতে তৈরি করা হয় একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র। সংসদ ভবন এলাকায় নির্মিত হয় স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের জন্য আবাসিক ভবন। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়সূত্র জানান, নকশা হাতে পাওয়ার পরই লুই আই কানের নতুন ঢাকার নকশা বাস্তবায়নের কাজে হাত দেবে সরকার। হবে নতুন সংসদ সচিবালয়সহ অনেক নতুন স্থাপনা। আবার উচ্ছেদ হবে নকশাবহির্ভূত অনেক স্থাপনা। তবে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রসহ কিছু স্থাপনা লুই কানের নকশার সঙ্গে সমন্বয় করা হবে বলে জানা গেছে। কিন্তু এ নকশা বাস্তবায়ন শুরু করলে বদলে যেতে শুরু করবে শেরেবাংলানগর এলাকার স্কাই ভিউ। সংসদ এলাকার ভিউও বদলে যাবে অনেকটা। জানা যায়, গত বছর পরিকল্পনা কমিশনের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লুই কানের নকশার ভিত্তিতে শেরেবাংলানগরে বাংলাদেশ সচিবালয়ের নতুন কমপ্লেক্স নির্মাণের নির্দেশ দেন। সে অনুযায়ী প্রকল্প তৈরির সময় লুই কানের নকশা খুঁজে আনার বিষয়টি প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হয়। আবার এর আগেই সংসদ এলাকায় স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের নকশাবহির্ভূত বাসভবন নির্মাণ বন্ধ করতে পরিবেশবাদীরা আদালতে গেলে এক রায়ে লুই আই কানের নকশা আদালতে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে নকশা আনার উদ্যোগ নেয় সরকার। দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং সংসদ সচিবালয়কে। 
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন

Post a Comment