শেষ ওভারে চার ছক্কার বর্ণনা দিলেন ব্র্যাথওয়েট


শেষ ওভারে প্রয়োজন ১৯ রান। রীতিমত অসম্ভবক একটি ব্যাপার। একে তো চলছে ডেথ ওভারের খেলা। আগের ওভারেই ক্রিস জর্ডান দিয়েছিলেন মাত্র ৮ রান। এ অবস্থায় বেন স্টোকসের কাছ থেকে কিভাবে এই ১৯ রান নিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে জেতাবেন কার্লোস ব্র্যাথওয়েট! শেষ পর্যন্ত পুরো বিশ্বকে চমকে দিয়ে সত্যি সত্যি ক্যালিপসো সুর তুললেন ক্যারিবীয়রা। ইংল্যান্ডকে ৪ উইকেটে হারিয়ে স্বপ্নের এক ফাইনাল জিতে নিলো ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

শেষ মুহূর্তে এতটা চাপের মুখে কিভাবে এমন বড় বড় শট খেললেন কার্লোস? জানার জন্য তাকেই খুঁজছিলেন সাংবাদিকরা। পেয়েও গেলেন। সারা রাত উৎসব করার পরও ক্যারিবিয়ানরা ট্রফি পোজ দেয়ার জন্য চলে গেলেন কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে। ছবি তুললেন ড্যারেন স্যামি এবং স্টেফানি টেলর। সেখানেই সাংবাদিকরা পেয়ে গেলেন ব্র্যাথওয়েটকে।

সময় দিলেন মাত্র ৫ মিনিট। অথচ কী প্রাণবন্ত। কথা বলতে গিয়ে দেখালেন চূড়ান্ত স্পোর্টসম্যানশিপ মানসিকতা। সবার আগেই ক্ষমা চেয়ে নিলেন বেন স্টোকসের কাছে। কারণ প্রতিযোগিতার কারণেই শুধু স্টোকসকে এভাবে পিটিয়েছেন। না হয়, তাদের মধ্যে সম্পর্ক খুবই চমৎকার।

ক্রিস জর্ডানের ওভার থেকে তেমন রান তোলা যায়নি। ব্র্যাথওয়েট ভেবেছিলেন শেষ বলে অন্তত একটি বাউন্ডারি মারবেন তিনি। তাহলে স্যামুয়েলস শেষ ওভারে ব্যাট করার সুযোগ পাবেন। তিনিই খেলাটাকে ধরে রেখেছেন, তারই ম্যাচ শেষ করার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু ব্র্যাথওয়েট নিলেন মাত্র ১ রান। ফলে শেষ ওভারে স্টোকসের সামনে পড়ে গেলেন আবার ব্র্যাথওয়েটই। শেষ পর্যন্ত সত্যিকারের চ্যাম্পিয়ন ব্র্যাথওয়েটই। 

আপনি কি ১৯তম ওভারজুড়ে স্যামুয়েলসের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন?

আমরা আসলে জর্ডানের পরিকল্পনা সম্পর্কে বুঝতে পেরেছিলাম। তিনি খুবই ভালো বল করছিলেন। বিশেষ করে ডেথ ওভারে তো একের পর এক ইয়র্কারই দিতে থাকে। এ কারণে পুরো ওভারেই আমরা চেয়েছিলাম তাকে লম্বা শট খেলতে। তবে তিনি আমাদের বাধ্য করেছিলেন অফসাইডে খেলতে। আমি চেষ্টা করেছিলাম এক্সট্রা কভারের ওপর দিয়ে একটা স্কুপ কিংবা মিড অফের ওপর দিয়ে একটা বাউন্ডারি মারতে। চেষ্টা করেছি স্যমুয়েলসের কাছ থেকে চাপ কমাতে। ১৯তম ওভারের শেষ বলেও চেয়েছিলাম বাউন্ডারি মারতে। কিন্তু ক্রিস দুর্দান্ত এক ইয়র্কার করলো এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটা হয়ে গেলো সিঙ্গেল। স্ট্রাইকে আবারও আমি।


শেষ ওভারের প্রথম বল!

দুই ওভারের অর্থই আমার কাছে স্পষ্ট ছিল। তবুও আমার কাছে এলেন স্যামুয়েলস। আমরা আলাপ করলাম। বল ব্যাটে লাগুক আর না লাগুক দৌড়াবো। রান নেবো যত সম্ভব বেশি। সে আমাকে বলেছে, শুধু গোড়ালির ওপর দাঁড়িয়ে বল ঘুরিয়ে দিতে। ব্যাটে বল লাগাও, তাহলেই আমরা এর সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে পারবো।

শেষ ওভারের প্রথম বলটা এলো লেগ সাইডে একটু নীচু হয়ে। আমি একটু তুলেই মারলাম। আমি আসলেই এটাকে জোরে খেলতে চেয়েছিলাম। সৌভাগ্যবশত এটা ফাইন লেগের ওপর দিয়ে ছক্কা হয়ে গেলো। কারণ, এটা ছিল মাঠের একেবারে ছোট জায়গা। মারলন দৌড় শুরু করেছিল। ছক্কা হওয়ার পরও আমি জানতাম, বড় কাজ এখনও বাকি।

দ্বিতীয় বল...

দ্বিতীয় বলটা মারলান লং অনের ওপর দিয়ে। আমি চিন্তা করলাম প্রথম ছক্কা খাওয়ার কারণে তিনি (স্টোকস) তার মার্ক বদলে ফেলেছেন (ভুল করে)। আমি শুধু চেয়েছি বলের একেবারে নীচে আঘাত করতে। তবে আমি জানতাম, বলটা সুইংও করতে পারে। শেষে আমি দেখলাম যে বলটা ছক্কা হয়ে গেছে। আমি নিজেও অবাক। তখনেই বুঝলাম যে না আমরা জিততে যাচ্ছি। তবে জয় নিশ্চিত করতে তখনও কাজ বাকি ছিল।

এরপর তৃতীয় বল...

৪ বলে প্রয়োজন তখন ৭ রান। এবারও মারলন আমাকে বললেন ব্যাটে বল এলো কি এলো না আমরা দৌড়াবো। তবে সম্ভবত তৃতীয় বলটাই ছিল সবচেয়ে কঠিন বল এবং দুর্দান্ত এক শট। এটা মিস হিটও হতে পারতো। তবে আমি চিন্তা করেছি স্টোকস এই বলটাকে ভালোভাবেই ডেলিভারি দেবে। আমি এটাকে একটু সামনেই পেয়ে গেলাম এবং উড়িয়ে দিলাম লং অফের ওপর দিয়ে। এরপরই বুঝতে পারলাম, ওয়েস্ট ইন্ডিজই বিম্ব চ্যাম্পিয়ন।

তবে তখনও নিজেকে হারিয়ে ফেলিনি। কারণ তখনও ১ রান বাকি। কারণ, আমাকে আবারও গোড়ালির ওপর ঘুরে দাঁড়িয়ে শট খেলার চেষ্টা করতে হবে। দেখলাম খুব ক্লোজ ফিল্ডিং সাজিয়েছে ইংল্যান্ড। এবার আমি সত্যি সত্যি চিন্তা করলাম, বলটাকে যদি মাঠের বাইরে পাঠানো যায়, তাহলে চ্যাম্পিয়নশিপটা নিশ্চিতই আমাদের। এবার আমি বলটাকে আবারও ভালোভাবে দেখলাম এবং ভালোভাবে ব্যাটে-বলে লাগাতে পারলাম। শেষ বলটায়ও যখন ছক্কা হয়ে গেলো, তখন সবাই আমাকে বলতে শুরু করলো, চার বলে চার ছক্কা সত্যি সত্যি বিস্ময়কর। তবে আমি দেখিনি এবার কোথায় বল গিয়ে পড়েছে। পরে শুনেছি, ওটা মিড অন দিয়ে ছক্কা হয়েছে। তখন তো আমরা উৎসব শুরু করে দিয়েছি। বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপের উৎসব। অনুভূতি আমাদের ছাড়িয়ে গেছে অনেক দুর। আমরা হারিয়ে গেলাম উৎসবের মাঝে।

ব্র্যাথওয়েট কী চিন্তা করেছিলেন, সিঙ্গেল নিতে পারবেন?

দেখুন ফাইনাল ম্যাচের শেষ ওভার। এটা সব সময়ই খুব কঠিন যে অন্যকে পেছনে ফেলা। তবে আমাদের কঠিন পরিশ্রম এবং তিন বলে তিনটা ছক্কা চলে আসার পর নিশ্চিত হয়েছিলাম যেন আমরাই জিততে যাচ্ছি। তিন বলে ১ রান প্রয়োজন। এ সময় সিঙ্গেল নেয়ার চিন্তা করাটাও যেন কঠিন। কারণ, যে কোনভাবে রানআউট হয়ে যেতে পারেন আপনি। এ কারণে আমি চিন্তা করলাম আরেকটি গুড শট খেলবো। সুতরাং, শেষ বলটাও সেভাবে পেয়ে গেলাম এবং চেষ্টা করলাম ব্যাটে বলে সংযোগ ঘটাতে।

Source : jagonews24

Post a Comment