যে গ্রামের মানুষ জাতপাতহীন!


সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে।।
লালন কয় জাতের কী রূপ
আমি দেখলাম না দুই নজরে।
সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে।।

কেউ মালা’য় কেউ তছবি গলায়,
তাইতে যে জাত ভিন্ন বলায়
যাওয়া কিম্বা আসার বেলায়
জাতের চিহ্ন রয় কার রে
সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে।।

যদি ছুন্নত দিলে হয় মুসলমান,
নারীর তবে কি হয় বিধান,
বামন চিনি পৈতা প্রমাণ,
বামনি চিনে কিসে রে
সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে ।।

জগত বেড়ে জেতের কথা,
লোকে গৌরব করে যথা তথা
লালন সে জেতের ফাতা ঘুচিয়াছে সাধ বাজারে
সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে।।

শোনা যায়, অসাম্প্রদায়িক চেতনার সাধকপুরুষ লালন ফকিরের জাত-ধর্ম সম্পর্কে না কি কেউ জানতেন না। অবশ্য তিনি নিজেও জাতপাতে বিশ্বাসী ছিলেন না। তাই হিন্দু-মুসলিমসহ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার কাছেই অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন এই লোকশিল্পী। 

লালনের জাত-পরিচয় বিষয়ক গানগুলো বিশ্লেষণ করলে যে ব্যাপারটা ভালোভাবে অনুমান করা যায়, সেটা হলো, লালন সচেতনভাবেই তার পরিচয় গোপন করে রেখেছিলেন যাতে তাকে কোনো ধর্মে বা জাতে বেঁধে রাখা না যায়। লালন বারবার এটাই চেয়ে আসছিলেন, যাতে তার পরিচয় একজন মানুষ হিসেবে পরিচিতি পায়। 

জাতপাতে বিশ্বাসী নন ভারতের মধ্যপ্রদেশের রাজগড়ের মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজনও। তারা একসঙ্গে ভজন গান করেন, ‘কভি রাম বনকে কভি শ্যাম বনকে আনা প্রভু’। যেখানে বিশ্বজুড়ে সাম্প্রদায়িকতার বিষ, সেখানে হিন্দু-মুসলিম সমন্বয়ের এই ঘটনা সত্যিই অবাক করার মতো।

ভারতীয় এক গণমাধ্যম জানিয়েছে, ওই গ্রামে ঘুরে জানা যায় এক অদ্ভুত কাহিনি। ৩৫ বছর আগে রামসিং প্রহরী নামে এক ব্যক্তি বসবাস করতেন এই গ্রামে। পাঁচ জন হিন্দু-মুসলিম সহযোগীকে নিয়ে তিনি গ্রামে একতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই নাম সংকীর্তন ও ভজন শুরু করেছিলেন। তারপর এই দলে যোগ দেন গ্রামের অন্যরাও। ক্রমশই বড় হতে থাকে দল। একসময় গ্রামের সবাই সান্ধ্যকালীন ভজন গানের আসরে যোগ দেন।

শুধু এটুকুই নয়। ওরশ শরিফের সময় স্থানীয় হনুমান মন্দিরে পুজোপাঠের জন্য একটি চাদর আনা হয়। পূজা শেষ হলে সেই চাদর চড়ানো হয় বাবা বতখ সাহানির মাজারে। আর এখন এই গোটা রীতি উৎসবের একটা অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে। ফলে এই এলাকায় একে-অপরের প্রতি সদ্ভাব, ভ্রাতৃত্ববোধের চিরস্থায়ী বন্ধনও অটুট রয়েছে।

বিশ্বজুড়ে সাম্প্রদায়িক হানাহানির এই বিরূপ সময়ে ওই গ্রাম এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। ওই গ্রামের মানুষের অসাম্প্রদায়িকতা, জাতপাতহীন মানুষ পরিচয়ে বড় হওয়ার গল্প থেকে এ বিশ্ব শিক্ষা নেবে, এমনটাই ভাবছেন সুধীজন।
সূত্র :বাংলাম্ইল২৪

Post a Comment