আগুনে পথে বসলেন ২০০ আড়তদার


পবিত্র মাহে রমজান আসতে আর মাত্র দেড় মাস বাকি। রোজাকে সামনে রেখে দেশের সর্ববৃহৎ কাঁচাবাজার কারওয়ান বাজারে ডাল, ছোলা, খেসারি, মসলা, হলুদ, মরিচসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আগাম মজুদ করে রেখেছিলেন আড়তদাররা। কিন্তু গত রবিবার সন্ধ্যায় জনতা টাওয়ারের পেছনে হাসিনা মার্কেটে শর্টসার্কিট থেকে লাগা আগুনে দেশের অন্যতম বৃহৎ এ আড়তের সব পণ্য নিমেষেই ছাই হয়ে গেছে। যেসব আড়তদার পণ্য আগাম মজুদ রেখেছিলেন, মুহূর্তেই তাঁরা সর্বস্বান্ত হয়েছেন। ব্যাংক কিংবা আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে যাঁরা ঋণ নিয়েছেন, তাঁদেরও মাথায় হাত। কিভাবে ঋণ পরিশোধ করবেন, নতুন ঘর তুলবেন তা ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। মহান মে দিবস উপলক্ষে রবিবার ছিল ছুটির দিন। তাই অনেকে ক্যাশে টাকা রেখে গেছেন। কিন্তু আগুনের লেলিহান শিখায় সে টাকাও পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। টাকার অঙ্কে ক্ষতির পরিমাণ এখনো নিরূপিত হয়নি। তবে ক্ষতি কাটিয়ে আবার ব্যবসায় ফিরতে পারবেন খুব কমসংখ্যক ব্যবসায়ী।

আগুন লাগার ঘটনায় ওই রাতে নিষ্ঠুর ও অমানবিক ঘটনাও ঘটেছে হাসিনা মার্কেটে। কিছু সুযোগসন্ধানী দুর্বৃত্ত ব্যবসায়ীদের দোকানে ঢুকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলেও গতকাল বেশ কয়েকটি অভিযোগ পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যও গোপনে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা এমনও অভিযোগ করছেন, যেহেতু এখানে সিটি করপোরেশন বহুতল ভবন করবে তাই ‘আগুন দিয়ে উচ্ছেদ’ করা হলো। কারো অভিযোগ, ফায়ার সার্ভিস যথেষ্ট চেষ্টা করেনি। কম পানি নিয়ে, কালক্ষেপণ করে তারা আগুন নেভানোর চেষ্টা করেছে। যদিও এসব অভিযোগ ‘বানোয়াট’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

রবিবার রাতে হাসিনা মার্কেট ঘুরে জানা গেল, পুরো মার্কেটে অন্তত ২০০টি দোকান ছিল। টিনের ও কাঠের হওয়ায় সব দোকানই পুড়ে গেছে। ছুটির দিন থাকায় নবী নামের এক বিকাশ এজেন্ট তাঁর ক্যাশে পাঁচ লাখ টাকা রেখেছিলেন। রাত সাড়ে ১০টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠানে ছাই ছাড়া কিছু পাননি। মোহাম্মদ জুয়েল নামের এক আড়তদার আগুন লাগার পর তিনটি মরিচের বস্তা সরাতে পেরেছিলেন। বাকি ২০টি মরিচের বস্তা এবং ১৩০টি হলুদের বস্তা পুড়ে ফায়ার সার্ভিসের ছিটানো পানির সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে গেছে। হাসিনা মার্কেটে অনেক হোটেল ছিল, সব হোটেল পুড়ে গেছে। একাধিক হোটেলের মালিক জানিয়েছেন, তাঁদের ক্যাশে টাকা ছিল, কিন্তু সব টাকাই পুড়ে গেছে। তবে রবিবার রাতে আগুনের কারণে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা এখন পর্যন্ত নিরূপণ করা যায়নি। কোনো আড়তদার ও ব্যবসায়ী তাঁদের পণ্য সরাতে পারেননি। কোনোমতে নিজের জীবন নিয়ে বের হয়ে গেছেন। আবদুল হালিম নামের এক হলুদ ও মরিচ আড়তদার যখন তাঁর মাল সরাতে ব্যস্ত, ঠিক সে সময় তাঁর ক্যাশবাক্স থেকে দুর্বৃৃত্তরা কয়েক লাখ টাকা নিয়ে সটকে গেছে। কয়েকজন ব্যবসায়ী কালের কণ্ঠকে বলেন, আগুন লাগার ঘটনায় আসছে রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ওপর প্রভাব পড়বে। যার ফলে প্রভাব পড়বে ভোক্তার ওপরও। তাঁরা বলছেন, রমজান মাসকে সামনে রেখেই তাঁদের প্রস্তুতির সময়ই আগুনটা লাগল। এ জন্য তাঁদের ক্ষতির পরিমাণও বেশি। ঢাকার অনেক স্থানেই তাঁদের পণ্যে ছোট ব্যবসায়ীরা রমজান মাসের মজুদ নিয়ে যেতেন। ফলে রমজানের বাজারে এর প্রভাব পড়তে পারে।

রবিবার রাতে কালবৈশাখীর পর আকস্মিক আগুনের ঘটনায় দুই শতাধিক দোকান পুড়ে ছাই হয়ে গেলেও হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। আগুনের কারণ নিয়েও রহস্য রয়েছে। আগুন নির্বাপণের ক্ষেত্রেও খামখেয়ালিপনার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সার্বিক ঘটনা তদন্তে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, ঢাকা সিটি করপোরেশন উত্তর মেয়র আনিসুল হকসহ ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের নেতারা। ঢাকা জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে একটি টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্তদের খোঁজ-খবর নিয়েছেন। সেই সঙ্গে ঢাকা জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ত্রাণসামগ্রী দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় আগুনের সূত্রপাত্র হয়। ঘটনার শুরুতেই তেজগাঁও ফায়ার স্টেশন থেকে কয়েকটি গাড়ি আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে। এরপর রাত পৌনে ১০টার দিকে আগুন নেভানো পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিসের ২৬টি ইউনিট কাজ করে বলে জানান ঘটনাস্থলে উপস্থিত ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদ। আগুন নেভানোর পরপরই ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক। সে সময় তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, এই মার্কেটে ১৮৬টি দোকান স্থায়ী বরাদ্দ ছিল। এ ছাড়া আরো কিছু অস্থায়ী ছিল। এর সবই আগুনে পুড়ে গেছে। ভয়াবহ ঘটনায় কমপক্ষে শত কোটি টাকার মালামাল পুড়ে গেছে বলে ধারণা পাওয়া গেছে।

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা বলেন, আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত ওই দোকানগুলোর বেশির ভাগই ছিল মসলার আড়ত ও মুদি দোকান। এর বড় একটি অংশজুড়ে ছিল আদা, রশুন, পেঁয়াজ ও মরিচের আড়ত। ছিল পাইকারি সিগারেট, হোটেল ও হলুদ-মরিচ গুঁড়ো করার কিছু মিল। পাশাপাশি লেপ-তোশকের দোকানও ছিল। ব্যবসায়ীদের তথ্য মতে, ওই মর্কেটে সবচেয়ে বেশি মুদি দোকান ছিল। আর্থাৎ প্রতিটি মুদি দোকানে চাল, ডাল, লবণ, তেল, আদা, জিরা, মসলাসহ বিপুল পরিমাণ খাদ্যসামগ্রী তাঁরা পাইকারি হিসেবে বিক্রির জন্য রেখেছিলেন। মুদি দোকানদার ইসলাম হোসেন, মহিউদ্দিন, বেলায়েত, বাবুল, হানিফ, মোবারক, সেলিম ও আহসান উল্লাহসহ আরো অনেক ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্যের পাশাপাশি আরো জানা যায়, পুড়ে যাওয়া মার্কেটের নিচতলার একটি দোকানের ভেতর থেকে আগুনের সূত্রপাত। মার্কেটের ভেতরের একটি খাবার হোটেলের গ্যাসের চুলা থেকে আগুন লেগে তা ছড়িয়ে পড়তে পারে। তা মুহূর্তেই পাশের দোকানগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন লেগেছে এমন কথাও বলছেন কেউ কেউ।

কিছু ব্যবসায়ীর মতে, কেউ পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগিয়ে দিতে পারে। তাদের মত সিটি করপোরেশন এখানে বহুতল ভবন করবে। তাদের সরে যাওয়ার নেটিশও দেওয়া হয়েছে। ফলে অগ্নিকাণ্ডকে তাঁরা বলছেন নাশকতা। তবে এর সপক্ষে জোরালো কোনো যুক্তি নেই তাঁদের। ফায়ার সার্ভিসের গাফিলতির কথাও কেউ কেউ বলেছেন। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে এ সংস্থাটির কর্মকর্তাদের দাবি, সঠিক সময়ে এসে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে আগুন নিয়ন্ত্রণে এনেছেন তাঁরা। প্রাথমিকভাবে তাঁদের ধারণা, বৈদ্যুতিক সর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তবে ঘটনার আগে বৈশাখী ঝড় আর বৃষ্টির কারণে ওই এলাকায় কোনো বিদ্যুৎ ছিল না। এর কারণে বৈদ্যুতিক সর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগার সত্যতা সঠিক নাও হতে পারে। তবে যেভাবেই আগুন লাগুক না কেন ঘটনা তদন্তে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের কিছুটা খামখেয়ালিপনা ছিল। আগুন লাগার পর প্রথমে ফায়ার সার্ভিসের যেসব গাড়ি এসেছিল তাতে তেমন পানি ছিল না। ফলে কার্যকর চেষ্ট চালাতে ফায়ার সার্ভিসের সময় ক্ষেপণ হয়েছে। এতে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার শুরুতেই ঠিকমতো পানি দিতে পারলে এত বেশি ক্ষয়ক্ষতি হতো না। উচ্ছেদ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পরিকল্পিতভাবেও আগুন লাগানো হতে পারে—ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল এ ধরনের অভিযোগ সম্পর্কে তদন্ত ছাড়া কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি সাংবাদিকদের জানান, ঘটনার তদন্তের পর আগুন লাগার কারণসহ পরবর্তী সময় কী ধরনের অবহেলা ছিল তা বলা সম্ভব হবে। আগুনে ব্যবসায়ীদের বড় ক্ষতি হয়েছে, এই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য যা যা করা দরকার সরকার তা করার চেষ্টা করবে।

জানা গেছে, কারওয়ান বাজার মার্কেট সরানোর জন্য যাত্রাবাড়ী, আমিনবাজার ও মহাখালীতে তিনটি মার্কেট প্রস্তুত করেছে সিটি করপোরেশন। এ নিয়ে কারওয়ান বাজারে অবস্থিত ব্যবসায়ীদের সরে যেতে কয়েক দফা সময় দেওয়া হয়। কিছু ব্যবসায়ী ইতিমধ্যে সরে গেছেন। অন্যরা সরে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি মেয়রকে দিয়েছেন। এসব নিয়ে ওই এলাকায় অনেক ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শনকারী ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক আরো বলেছেন, হাসিনা মার্কেটের আগুন একটি দুর্ঘটনামাত্র। এতে ব্যবসায়ীদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এটা দুঃখজনক ঘটনা। তবে উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।

গতকাল সোমবার সকালে জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে একটি প্রশাসনিক টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। ওই টিমের প্রধান নুরুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, সিটি করপোরেশনের অধিভুক্ত ১৮৬টি দোকানসহ আরো বেশ কিছু দোকান আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সিটি করপোরেশনের অধিভুক্ত ক্ষতিগ্রস্ত দোকান মালিকদের ত্রাণ সুবিধা দেওয়া হবে।

আগুনের ঘটনা তদন্তে কমিটি : হাসিনা মার্কেটে আগুনের ঘটনা তদন্তে চার সদস্যের কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস। গত রবিবার রাতে ওই কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটির নেতৃত্বে আছেন ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক মোজাম্মেল হক। অন্যরা হলেন সহকারী পরিচালক (ঢাকা) মাসুদুর রহমান আকন্দ, উপসহকারী পরিচালক (ঢাকা) সালাহ উদ্দীন ও জ্যেষ্ঠ স্টেশন অফিসার (তেজগাঁও) তানহারুল ইসলাম। ঘটনাস্থলে উপস্থিত ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, তাৎক্ষণিকভাবে আগুনের সূত্রপাত সম্পর্কে জানা যায়নি। তবে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে ২৬টি ইউটি কাজ করেছে। ঘটনাস্থলে দাহ্য পদার্থ থাকায় আগুন লাগার পরপরই তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এর সঙ্গে বৈশাখী বাতাস ছিল। এভাবে বিভিন্ন কারণে আগুন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে ক্ষতি বেশি হয়।

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা যা বলেন : ব্যবসায়ী সেলিম মিয়া বলেন, ‘আমার দোকানের শাটারটাই আছে, আর কিছুই নাই, সব পুড়ে ছাই। মার্কেটের ভেতরে এখন শুধুই পোড়া টিনের খণ্ডবিশেষ পড়ে আছে। আগুনে পুড়ে টিনের রং পরিবর্তন হয়ে গেছে।’ ঘটনাস্থলে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মার্কেটের ১৩৬ নম্বর দোকানের মালিক আলমগীর ভুঁইয়া বলেন, ‘মার্কেটে আমার তিনটি দোকান ছিল। সেখানে চাল-ডালের মুদি দোকান, হলুদ-মরিচ ও চায়ের দোকান ছিল। আজ সব শেষ।’

আগুনের সূত্রপাত প্রসঙ্গে উত্তর কারওয়ান বাজার ব্যবসায়ী জনকল্যাণ সমিতি মার্কেট কমিটির যুগ্ম সম্পাদক শাহাদাত খান সুমন বলেন, ‘জেনারেটরের শর্টসার্কিট থেকে এত বড় ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করছি। শর্টসার্কিট থেকে প্রথমে একটি দোকানে আগুন লাগে, পরে বাতাসে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এতে পুরো মার্কেট পুড়ে যায়।’

কারওয়ান বাজারের ওই মার্কেটের পানির পাম্পের তত্ত্বাবধায়ক আবদুল রশিদ বলেন, ‘রাত সাড়ে ৮টার দিকে আমি আমার দোকানে বসা ছিলাম। তখন শুনি গলির ভেতরে একটি দোকানে আগুন লেগেছে। আমরা পাঁচ থেকে ছয়জন দৌড়ে যাই। কিন্তু ওই দোকানটি তখন বন্ধ ছিল। আমরা দোকানের শাটার ভাঙার চেষ্টা করি। কিন্তু ভাঙার আগেই দাউদাউ করে আগুন বাইরে চলে আসে। আগুনের অনেক তাপের কারণে সেখানে থাকতে পারিনি। আর মুহূর্তের মধ্যেই তা মার্কেটের অন্য দোকানে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। পাশে আমার ভাগ্নে দেলোয়ারের দোকান, সেটাও পুড়ে যায়। তখনো ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি আসেনি। কিন্তু আমরা নিজেরা চেষ্টা করেও আগুন ছড়ানো ঠেকাতে পারিনি।’

সব হারিয়ে হা-হুতাশ : পাশাপাশি ১২ জন ব্যবসায়ী নিজ নিজ দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁদের সবাই অশ্রুসিক্ত। কাছে যেতেই জানালেন নানা কষ্টের কথা। কেউ বলছেন, আগুনে তাঁর ২০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। কেউ বলেন, ৩০ লাখ, আবার অরেকজন বলেন ৫০ লাখ। এভাবে  ভয়াবহ আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত দুই শতাধিক দোকান মালিকের প্রত্যেকের লাখ লাখ টাকা ছাই হয়েছে।

গতকাল দুপুরে পুড়ে যাওয়া মার্কেটে গিয়ে দেখা যায়, ব্যবসায়ীরা ছাই-ভস্মে হাতড়াচ্ছেন। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কিছুই অবশিষ্ট নেই পোড়ার। সব ছাই-ভস্ম নিয়ে বিলাপ করছেন ব্যবসায়ীরা। তবু এর মাঝেই কিছু পাওয়ার চেষ্টা করছেন তাঁরা। নিজের পুড়ে যাওয়া দোকানে ছাই-ভস্ম দেখে অনেকে ডুকরে ডুকরে কাঁদছেন। এমন দৃশ্য দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে আগতরাও। পুড়ে যাওয়া ওই মার্কেটের যুগ্ম সম্পাদক শাহাদাত খান সুমন বলেন, অন্তত ১০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত সরকার বা অন্য কারো তরফ থেকে ক্ষতিপূরণের আশ্বাস পাওয়া যায়নি।

মার্কেট কমিটির ধর্মবিষয়ক সম্পাদক মো. হাফিজ বলেন, ক্ষতির পরিমাণ এখনো হিসাব করা হয়নি। আগুনে তাঁর নিজের প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে দাবি করে এই ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমাদের কেউ কোনো আশ্বাস দেয়নি। কারো সঙ্গে আমাদের কোনো কথাও হয়নি। এ ছাড়া কতই বা দেবে। এ ক্ষতি পোষানোর নয়।’ সেলিম নামের আরেক ব্যবসায়ী বলেন, ‘লাখ লাখ নগদ টাকা পুড়ে গেছে। আমিও চার লাখ টাকা আগুনের মধ্যে রেখে এসেছি।’

নজরুল ইসলাম মন্টু বলেন, ‘আমার প্রায় ৬০ লাখ টাকার মালামাল পুড়ে গেছে। আগুনে ব্যবসায়ীদের অনেক নগদ টাকা পুড়ে গেছে।’ আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় কোনোভাবে জীবন নিয়ে বেঁচে এসেছেন বলে জানান একাধিক ব্যবসায়ী।

তাঁদের ভাষ্য মতে, টানা তিন দিন ব্যাংক বন্ধ থাকাটা উচিত হয়নি। শনিবার অন্তত আধা বেলা ব্যাংক খোলা থাকলে ব্যবসায়ীরা নগদ টাকাগুলো রাখতে পারতেন।

আশ্বাসে আস্থা নেই  : যদিও রবিবার রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সরেজমিনে গিয়ে বলেছিলেন, সরকার ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণ দেবে। তবে এতে আশ্বস্ত হতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। কারণ এর আগে বিএনপির আমলে কারওয়ান বাজারে একবার আগুন লেগেছিল। তখনকার মেয়র সাদেক হোসেন খোকা সরেজমিনে গিয়ে ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সেটি প্রতিশ্রুতির মধ্যেই রয়ে গেছে। ব্যবসায়ীদের কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি সরকারের পক্ষ থেকে। এবারও একই ধরনের ঘটনা ঘটবে বলে আশঙ্কা ব্যবসায়ীদের। তাই অনেক ব্যবসায়ী গতকাল সোমবার থেকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা শুরু করেন। সরকারের দিকে তাকিয়ে না থেকে নিজের প্রচেষ্টায় আবারও ব্যবসা চালু করার প্রাণান্তকর চেষ্টা শুরু করেছেন অনেকে।

এদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, পুড়ে যাওয়া দোকান নতুন করে চালু করতে বেশ সময় লাগবে। তত দিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যেসব পণ্য কারওয়ান বাজারে আসবে, সেগুলো কোথায় রাখবেন তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। এতে করে খুচরা ব্যবসায়ীরাও বিপাকে পড়বেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কারওয়ান বাজারে পণ্য আসে এবং সেই পণ্য আবার  দেশের অন্যান্য জেলায় যায়। কিন্তু এখন পণ্য সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটছে। তবে ব্যবসায়ীদের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল, সেটি কাটিয়ে উঠতে তাদের কয়েক বছর লেগে যেতে পারে। কারণ একেকজন ব্যবসায়ীর লাখ এবং কোটি টাকাও ক্ষতি হয়ে গেছে।

জানতে চাইলে কারওয়ান বাজার ক্ষুদ্র কাঁচামাল বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি এ টি এম ফারুক গতকাল রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, আগুনে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা অপূরণীয়। তিনি বলেন, আগুন লাগার পর এখন পর্যন্ত বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়নি। সমিতির সভাপতি আরো বলেন, সামনে রমজান, তাই আড়তদাররা প্রচুর পণ্য আগাম মজুদ করেছিলেন। সেসব পণ্য পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ায় আসছে রমজানে এর একটা প্রভাব তো পড়বেই।

Source: kalerkantho

Post a Comment