ঢাকা অ্যাটাক, জ্ঞানী ব্যক্তি এবং আমরা নির্বোধরা


নানা কথা, আলোচনা। যুক্তি তর্ক। সাথে গালিগালাজ। চলছে নানা ভঙ্গিমায় জ্ঞান বিতরণ। ঢাকা অ্যাটাকের পর এই হলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর অবস্থা। নানা মুনির নানা মত। নানা কায়দায় চলছে জ্ঞান বিতরণের কোশেস। কেউ বিতরণ করছেন ইসলামী কায়দায়, কেউ আবার সেক্যুলারি স্টাইলে। কঠিন সব তত্ত্ব জাহির করে নিজের জ্ঞানের ঘনত্ব প্রকাশ করছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ‘জ্ঞানী’ লোকেরা। গণমাধ্যমও পিছিয়ে নেই। কাগজ ও ‘অনলাইন কাগজ’ সবখানেই শুধু জ্ঞান বিতরণ। আর জ্ঞান বিতরণের বিষয় একটাই ‘ধর্মই যত অধর্মের মূল’।

‘বিদগ্ধ’ সব লোকেরা এ বিষয়ে তাদের ‘দগ্ধ’ জ্ঞানের ভাণ্ডার খুলে দেওয়ায় আমাদের মতো স্বল্পজ্ঞানী, অল্পাহারী এবং অনেকের মতে নিরেট নির্বোধরা যারপরনাই বিস্মিত ও পুলকিত। বিস্মিত এ জন্য যে, আমাদের দেশে জ্ঞান বিতরণের এত উৎস আছে তা না জানার অজ্ঞতায়, আর পুলকিত এত জ্ঞানপ্রাপ্ত অমূল্য বচনের ‘অসম্ভব’ আবিষ্কারের উন্মাদনায়।

ঢাকা অ্যাটাকের পর শোলাকিয়া। দুটো ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম জ্ঞানীদের জ্ঞান বিতরণের ফলে মোটামুটি জ্ঞানের সমুদ্র হয়ে গেছে। এমনসব জ্ঞান বিতরণ করা হচ্ছে ধর্মের ‘আগাপাশতলা’ বিশ্লেষণ করে, যাকে রীতিমতো শিহরণ জাগানিয়া হিসাবে আখ্যা দেওয়া যায়। 

দুই ভাগে বিভক্ত জ্ঞানী ভাইয়েরা কেউ ধর্মকে দায়ী করছেন সমস্ত উগ্রপন্থার জন্য, কেউ আবার নানা বয়ান দিয়ে বুঝিয়ে দিতে চাইছেন ধর্ম কখনও সন্ত্রাসকে প্রশ্রয় দেয় না। কিন্তু এই যে ধর্মের পক্ষে বিপক্ষের বাহাস যারা করছেন তারা কী কখনো ভেবেছেন সারা বিশ্বে সংঘাত সন্ত্রাসের কারণ কী শুধুই ধর্ম? ধর্ম ছাড়া কী অন্য কোনো কারণে কোথাও কোনো সংঘাত হয়নি? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কী ভাই ধর্ম নিয়ে হয়েছিল? হিরোশিমায়, নাগাশাকিতে আনবিক বোমা কী আল্লাহু আকবার ধ্বনি দিয়ে পড়েছিল?

জ্ঞানী ভাইরা অবশ্যই রুয়ান্ডার নাম শুনেছেন সেখানে দুটি সম্প্রদায় হুতু আর তুতসি। ইতিহাসে সম্প্রদায়গত দ্বন্দ্বে দুটি মানব গোষ্ঠীর মধ্যে এত বড় ম্যাসাকার বোধহয় খুব কমই আছে। অন্য দিকে বর্ণবাদ। কালো সাদার দ্বন্দ্বে কত দাঙ্গার সাক্ষীই না আফ্রিকা থেকে আমেরিকা এমনকি ব্রিটেনের মানুষ। 

কদিন আগে ঘটে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ডালাস হত্যাকাণ্ডকে কী বলবেন? সেখানে সেনাবাহিনীর সাবেক এক কালো সদস্য সাদা পুলিশদের কী কারণে হত্যা করেছিলেন? কারণ সাদা পুলিশ কালো দুই লোককে গুলি করে মেরে ফেলেছিল আর তার শোধ নেওয়ার জন্যই পুলিশসহ পাঁচ জনকে গুলিতে হত্যা করা হয়েছে। এখানে কোন ধর্ম কাজ করেছে?  জ্ঞানী ভাইয়েরা এখানেও কী কোনোভাবে ধর্মকে সম্পৃক্ত করা যায়? জানি যায় না। গেলে আপনারা বসে থাকতেন না।  

‘আভিজাত্য’ তথা নীলরক্তের দাবিদার জার্মানিরা কী ধর্মীয় কারণে ইহুদীদের গ্যাস চেম্বারে পুড়েছিল! আমাদের পাশেই শ্রীলংকা। তামিল ও সিংহলীদের সম্প্রদায়গত বিদ্বেষ কী অজানা কারো! জ্ঞানী ভাইয়েরা এই দুই সম্প্রদায়ের ধর্মীয় পরিচয় বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল না তামিল সিংহলী পরিচয়টিই হয়ে দাঁড়িয়েছিল মুখ্য?

আবার রুয়ান্ডার কথায় আসি। জ্ঞানী ভাইদের বলছি, রুয়ান্ডার এই জাতিগত সংঘাতের কারণ আপনারা নিশ্চয়ই আমার চাইতে ভালো জানেন। সেখানে সংখ্যালঘুরা শাসন করত সংখ্যাগরিষ্ঠদের এবং তাদের অত্যাচারে সংখ্যাগরিষ্ঠদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছিল। তারপর কী হয়েছিল ভাইয়েরা?

আমার মতো সাধারণ ও ক্ষুদ্র জ্ঞানের মানুষের ধারণা, সংঘাত সন্ত্রাসের জন্য ধর্ম লাগে না, লাগে একটা অজুহাত। আজ যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বড় বড় কথা বলছেন, তাদের যদি ক্ষমতা দেওয়া হয় ধর্ম বিষয়টি আপাতত পৃথিবী থেকে সাময়িক তুলে রাখা হোক তাহলে কী আপনারা গ্যারান্টি দিতে পারবেন সংঘাত সন্ত্রাস বন্ধ হয়ে যাবে?

পৃথিবীজুড়ে আতংক আর সন্ত্রাসের কারণ হচ্ছে ‘হেইট’ ঘৃণা। মানুষের মনে পুঞ্জিভূত ঘৃণা থেকে জন্ম ক্ষোভের এবং পরে তা বিস্ফোরিত হয় ক্রোধের উন্মত্ততায়। সুতরাং আমাদের মতো নির্বোধেরা এটুকুই বোঝে, সংঘটিত সন্ত্রাসের মূল উৎপাটন করতে হলে আগে ঘৃণার কারণ বের করতে হবে। সারা বিশ্বে সন্ত্রাসের ধরণ এক হলেও কারণ এক নয়। কোন জায়গায় কোন ঘৃণাকে বাহন করে ছড়ানো হচ্ছে সন্ত্রাস, তা বের করাই হবে সন্ত্রাস বন্ধের প্রধান পদক্ষেপ। 

নিউটনকে নিয়ে একটি গল্প প্রচলিত আছে, তিনি না-কি বড় মুরগির জন্য বড় ঘর আর ছোট মুরগির জন্য ছোট ঘর বানাচ্ছিলেন। এমন সময় কেউ বলল বড় ঘরেই তো দুটি মুরগি থাকতে পারে। নিউটন সাহেব নানা তত্ত্ব নিয়ে বসে গেলেন প্রমাণ করতে, কী করে দুই মুরগি এক ঘরে থাকতে পারে। 

যারা জ্ঞানী, তারা বিজ্ঞানী নিউটনের মতো তত্ত্ব নিয়ে ভাবতে পারেন। কিন্তু আমাদের মতো ছোট মাথার মানুষরা ক্ষুদ্র জ্ঞানে বোঝে ‘দুর্জনের ছলের অভাব হয় না’। দুর্জন শুধু সুযোগ খোঁজে। আর দুর্জনের সুযোগ খোঁজার জায়গাটা করে দেন কথিত ‘সুজন’রাই ঘৃণা ছড়ানোর মাধ্যমে। 

মানুষ যেখানে নিপীড়িত হয়, অত্যাচারিত হয়, শোষিত হয়, শাসিত হয় সেখানে সৃষ্টি হয় এমন সুযোগের। নিপীড়িত, অত্যাচারিত, শোষিত, শাসিত হতে হতে মানুষের মনের ভেতরে এক ধরণের ভয়ংকর ক্ষোভের জন্ম নেয়। আর সেই ক্ষোভ যখন ক্রোধে পরিণত হয়, তখন তা আর ন্যায়নীতি ভেবে দেখে না। নিজের অসহায়ত্বের শোধ নিতে চায় যেকোনোভাবে।

আমি ছোট একটি উদাহরণ দিই। মানুষ যখন চাপের মুখে, বিশেষ করে শাসিত হবার ভয় কিংবা অত্যাচারিত হবার ভয়ের মধ্যে থাকে, তখন নিজের মধ্যেই এক ধরনের সেলফ সেন্সরশিপ চলে আসে। তা হোক চলনে কিংবা বলনে। কিন্তু যদি কখনো সুযোগ আসে তাহলে সেই চাপের বিরুদ্ধে, ভয়ের বিরুদ্ধে কোনো কিছু না ভেবেই ক্ষোভ উদগীরণ করাটাই স্বাভাবিক।

ঢাকা অ্যাটাকের পর আপনারা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের দিকে ভালো ভাবে তাকালেই তা বুঝতে পারবেন। যারা সংখ্যায় কম হবার কারণে হোক কিংবা অন্যকোনো কারণে হোক ইসলাম সম্পর্কে উক্তি করতে বিব্রত হতেন, তাদের অনেকের এখন কিন্তু মুক্ত মুখ। ঢাকা অ্যাটাকের পর তাদের ক্ষুব্ধ লাভার মুখ খুলে গেছে, তারা নিজেদের ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছেন সেই লাভার উদগীরণের মাধ্যমে ইসলামকে একহাত নিয়ে এবং তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক বিচার বুদ্ধির ধারে কাছে না থেকেই। 

ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ শুধু ঘৃণাই ছড়ায়। যারা আজকে ইসলামকে তথা ধর্মকে গালিগালাজ করছেন, আবার যারা ধার্মিক সেজে যুক্তিতর্কের বাইরে গিয়ে অন্যদের গালিগালাজ করছেন তারা আসলে কী করছেন! তারা ঘৃণা ছড়াচ্ছেন। এই ঘৃণা ছড়ানো বন্ধ করতে হবে। যুগে যুগে ধর্ম এসেছে সামাজিক বিশৃংখলাকে শৃংখলাবদ্ধ করে সমাজকে শান্তিময় রাখতে এবং মানুষকে কল্যাণের পথে নিতে যারা ধর্মকে অবলম্বন করে ঘৃণা ছড়াতে চান, তাদের এটা বেশি মনে রাখা উচিত। আর যারা ধর্মের গোঁড়া না বুঝে আগা নিয়ে টানাটানি করেন কিংবা আগা গোঁড়া দুটো ছেড়েই মধ্যে ঝুলে পড়েন তাদেরও গোঁড়া থেকে আগায় চড়তে হবে এবং বন্ধ করতে হবে ঘৃণা ছড়ানোকে। 

আমি নিজে ধর্ম নিয়ে কোনো কথা কখনো বলি না। কারণ আমি যা ভালো বুঝি না, তা নিয়ে জ্ঞানী জ্ঞানী আলোচনা করতে আমার শিক্ষা এবং রুচিতে বাধে। কিন্তু যখন দেখি যারা আসলেই কিছু বোঝে না, যাদের জ্ঞান পুরোপুরি ‘গুগল’ নির্ভর তাদের লেখার এবং বলার ধরন দেখলে সত্যিই বিষ্মিত হই। তাদের ঘৃণা ছড়ানোর যোগ্যতা ও দক্ষতা দেখেও বিষ্মিত হই।

পৃথিবীতে বেশিরভাগ মানুষের আবেগের জায়গাটা হলো ধর্ম। আর তাই বর্তমান পৃথিবীতে ধর্মাশ্রয়ী সন্ত্রাসের নজির বেশি। এক শ্রেণীর ‘দুর্জন’ আবেগের নরম জায়গাটার উপর কব্জা করে মানুষকে সম্মোহিত করে সারা পৃথিবীতে আতংক ছড়াচ্ছে, সন্ত্রাস ছড়াচ্ছে। আবার এই সন্ত্রাসকে উস্কে দিচ্ছেন কিছু মানুষ অহেতুক ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলে। তারা দুর্জনের ছলটাকে না ধর্মটাকেই সন্ত্রাসের কারণ হিসাবে বর্ণনা করে সেই সন্ত্রাসীদের মতোই ঘৃণা ছড়াচ্ছেন। আর এই দু’পক্ষের ঘৃণার ‘ক্রসফায়ারে’ পড়ে মরছে মানুষ।

তাই জ্ঞানী ভাইদের বলছি- আবেগ কিংবা ক্ষোভের বশে নয়, ক্রোধের জিঘাংসায় নয় মাথা ঠান্ডা করে জেনে বুঝে কথা বলুন, তাহলে হয়তো অনেক সমস্যারই সমাধান বের হয়ে আসবে। 

জানি আমার লেখা যারা পড়বেন তাদের কেউ কেউ হয়তো আমার প্রতি ক্ষুব্ধ হবেন, কেউ আরো দুপা এগিয়ে গালিগালাজ করবেন। করুন তাতে আপত্তি নেই। যুক্তি যেখানে শেষ হয়ে যায়, সেখান থেকেই গালির ব্যবহার শুরু হয়। কিন্তু ভেবে দেখা উচিত যুক্তির বিকল্প কখনো গালি হতে পারে না। সন্ত্রাসকে সন্ত্রাস হিসেবেই দেখুন। সন্ত্রাসীদের সন্ত্রাসী হিসেবেই দেখুন। এর বাইরে আর কিছু নয় এবং এর বাইরে আর কিছু নেইও। 

ফুটনোট: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খুব পরিচিত এক ব্যক্তি। তার প্রচুর মুগ্ধ অনুসারী রয়েছে। সঙ্গত কারণেই আমি তার নাম নিচ্ছি না। সেই ভদ্রলোকের সাথে ভাগ্যক্রমে আমার বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছে। প্রথমবার দেখাতে আমি ভদ্রলোকের একটি লেখায় ব্যবহৃত একটি উদ্ধৃতি সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলাম। কিন্তু ভদ্রলোক যার উদ্ধৃতি দিয়েছেন তার নাম এবং কর্মের কোনো কিছুই তিনি স্মরণ করতে পারলেন না। বেচারী কোনোরকমে বেঁচে যেতে তার ইদানীং কোনো কিছুই মনে থাকে না এমন একটি অজুহাত দিলেন। অবশ্য হাতের কাছে ল্যাপটপ কিংবা সেলফোনের পর্দায় তাকানোর সুযোগ থাকলে হয়তো তার স্মরণশক্তিটা বৃদ্ধি পেত। 

জ্ঞানী ভাইগণ, বেশি জ্ঞানীদের অবশ্যই এমন হতেই পারে জ্ঞানের চাপে, আধিক্যে কিছু জ্ঞান চিপায় পড়ে যেতেই পারে। কী বলেন?

কাকন রেজা: সাংবাদিক।

[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কম-এর সম্পাদকীয় নীতির মিল নাও থাকতে পারে।]

সূত্রঃ প্রিয়

Post a Comment