যে কারণে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছে ওরা



রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিসান রেস্টুরেন্টে হামলাকারীরা উচ্চশিক্ষিত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের। এমন তথ্য দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। আর এ তথ্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সর্বত্রই আলোচনা-সমালোচনা ঝড় উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে তারা কেন এই ধরনের কর্মকাণ্ড করতে যাবে।

সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, গোটা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি, আদর্শহীনতা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কিছু শিক্ষক ও রাজনীতিহীনতাই তরুণসমাজকে এ ধরনের কাজে উৎসাহ যোগাচ্ছে। তারা মনে করছেন, উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের অভিভাবকরা সঠিকভাবে সময় ও শিক্ষা কোনোটিই দিতে পারেন না। যার ফলে একাকীত্ব ও অ্যাডভেঞ্চার তাদেরকে এই ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাদেকা হালিম জাগো নিউজকে বলেন, নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলে-মেয়েদের খুব তাড়াতাড়ি জঙ্গি বানানো যায় এই তত্ত্ব ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তরুণদের আকৃষ্ট করার জন্য তাদেরকে বোঝানো হচ্ছে যেভাবে রাষ্ট্র চলছে এটা ঠিক নয়। এই রাষ্ট্রের মধ্যে অনেক দুর্নীতি। বিদেশিরা আমাদের সব নিয়ে যাচ্ছে। আমরা যদি নতুন রাষ্ট্র গঠন করি তাহলে সব ঠিক হয়ে যাবে।

এই পরিস্থিতি সৃষ্টির পেছনে কারণ হিসেবে তিনি মনে করেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ৪৫ বছর অথচ এখন পর্যন্ত আমরা একটি সুন্দর আদর্শ তৈরি করতে পারিনি। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর এই আদর্শহীনতা বেশি হচ্ছে। যারা রাজনীতি করেন তারা আমাদেরকে বেঁচে খান সারাদিন। বর্তমানে যে স্কুলগুলো হচ্ছে, যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হচ্ছে সেগুলো থেকে ছেলে-মেয়েরা হতাশ হচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে কিছু শিক্ষক সাধারণ শান্ত বাচ্চাদেরকে একটা অ্যাডভেঞ্চারের দিকে পরিচালিত করে থাকেন।

এই সমাজবিজ্ঞানী বলেন, সামগ্রিক দিক থেকে দেশের সর্বোপরি দুর্নীতি ও আদর্শহীনতার পাশাপাশি প্রগতিশীল রাজনীতি নেই। আমরা যখন বিদেশে পড়ালেখা করেছি, তখন সেখানে ছাত্রদের মাঝে আমরা নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। আমাদের দেশে এখন রাজনৈতিক শিক্ষাও নেই।

সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউটের শিক্ষক অধ্যাপক মোহাম্মদ সামাদ জাগো নিউজকে বলেন, ধনী পরিবারের পিতা-মাতারা সন্তান-সন্ততিদের খোঁজ-খবর রাখার বিষয়ে কম সময় দিয়ে একটা আর্থিক এবং সামাজিক প্রতিপত্তির পেছনে ছুটতে থাকে। এই বয়সে একটা বীরত্বের প্রতি আকর্ষণ থাকে। কারণ ধর্ম এদের কাছে বড় নয়। যারা এদেরকে সংগ্রহ করে তারা বোঝায়- স্বর্গে যাওয়ার যে পথ সেটা তাদেরটা (উগ্র) সঠিক। ফলে ধর্মীয় শাস্ত্রে স্বর্গ পাওয়ার যে পথ বাতলানো আছে তা এরা অনুভব করতে পারে না।

তিনি বলেন, উগ্রবাদীরা মিথ্যা কথা দিয়ে এভাবে তরুণদের প্রভাবিত করে। পরিবার-পরিজন এই বয়সী তরুণদের সময় দেয় না, ধর্মীয় শিক্ষা দেয় না, সামাজিক শিক্ষা দেয় না। এরা মানুষ হয় গৃহস্থালীর কাজের মানুষের কাছে আর বড় হলে গাড়ির চালকের সঙ্গে চলাফেরা করে। ফলে তারা খুব সহজেই যেকোনো বিষয় বিশ্বাস করে ফেলে।

সমাজকল্যাণের এই চিন্তক বলেন, মানসিক বিকাশ এবং সামাজিকীকরণের প্রবণতা থেকে এরা (হামলাকারীরা) একা হয়ে পড়ে। এই একাকীত্ব থাকার ফলে ধর্মান্ধরা তাদেরকে দ্রুত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য মোটিভেট করতে পারে। সুতরাং উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদেরকে বাবা-মা পরিবার ও সমাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে পারলে এ ধরনের প্রবণতা কমবে।

উল্লেখ্য, ১ জুলাই রাজধানীর গুলশানে হামলার ঘটনায় জড়িত থাকার পাঁচজনের ছবি প্রকাশিত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের পরিচয় উঠে আসে। সেই পরিচয় থেকে জানা যায়, ঢাকার স্বনামধন্য একটি স্কুলের একজন ছাত্র ও একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রও এই হামলায় জড়িত ছিলেন। তারা দুজনই উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান।

সূত্রঃ জাগোনিউজ২৪

Post a Comment