আব-ই-জমজম: আল্লাহর এক বিস্ময়কর ও রহস্যময় নিদর্শন


জমজম কূপের ইতিহাস:
মহান আল্লাহতায়ালা বিশ্বের সব বস্তুই সৃষ্টি করেছেন মানবকল্যাণে। আর বিশ্বের সব সৃষ্টি মানুষের জন্য নিয়ামতস্বরূপ। তার মধ্যে পানি একটি বিশেষ নিয়ামত। এই পানি ব্যতীত মানুষ এক মুহূর্তও চলতে পারে না। জমজম কূপের পানি পৃথিবীর সব পানির চেয়ে আলাদা। আর এ পানি স্বয়ং আল্লাহতায়ালার দেয়া স্বর্গীয় রহমতপূর্ণ। আজ থেকে প্রায় চার-সাড়ে চার হাজার বছর আগে, মধ্যপ্রাচ্যের পবিত্র ভূমি মক্কানগরী, যেখানে মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র জন্মস্থান, সেখানে মহাবরকতময় স্বর্গীয় পানি জমজম কূপের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এই পানি পৃথিবীর অন্যসব পানি থেকে ব্যতিক্রমধর্মী। জমজম কূপের উৎপত্তির সঙ্গে হজরত হাজেরা (আ.) এর স্মৃতিজড়িত। মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমে হজরত ইব্রাহিম (আ.) তার বড় স্ত্রী বিবি হাজেরা ও তার নবজাতক সন্তান হজরত ইসমাইলসহ (আ.) পবিত্র মক্কানগরে লুপ্ত কাবার কাছে নির্বাসন দেয়ার জন্য আদিষ্ট হন। 

তিনি আল্লাহর আদেশে স্ত্রী ও সন্তানকে কিছু পানি ও খেজুরসহ সেখানে রেখে যান। যাওয়ার সময় ইব্রাহীম (আ.) আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করেন, 'হে আল্লাহ! তুমি একে শান্তিময় নগরে পরিণত কর এবং আমাকে ও আমার সন্তানদের মূর্তিপূজা থেকে দূরে রাখ।' সুরা ইব্রাহীম। অপর আয়াতে বলা হয়েছে, 'হে আমাদের প্রতিপালক! তোমার সম্মানিত ঘরের কাছে এক অনাবাদি উপত্যকায় আমার এক বংশধরকে বসত করতে রেখে গেলাম। হে আমাদের প্রভু! তারা যেন সালাত কায়েম করে। তুমি কতিপয় লোকের মন তাদের প্রতি আকৃষ্ট করে দাও। তাদের জীবিকারূপে কিছু ফলমূল দাও। আশা করা যায়, তারা তোমার শোকর গোজার করবে। সুরা ইব্রাহীম। ইব্রাহীম (আ.) মা ও শিশু সন্তানের জন্য যে খাদ্য ও পানীয় রেখে গিয়েছিলেন, তা অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। ফলে মা ও শিশু সন্তান ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়েন। 

মা হাজেরা (আ.) এদিক সেদিক ছোটাছুটি করে কোথাও খাদ্য সংগ্রহ করতে না পেরে, নিকটস্থ সাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের চূড়ায় উঠে চারদিকে দৃষ্টিপাত করতে লাগলেন কোথাও কোনো জনমানবের কাফেলা দেখা যায় কি না। এভাবে তিনি আশায়-নিরাশায় উভয় পাহাড়ে পরপর সাতবার ওঠানামা করতে থাকেন। তার পুত্রস্নেহের এই দৃশ্যটি আল্লাহর কাছে খুবই পছন্দনীয় হয়েছে বিধায় আল্লাহতায়ালা এই স্মৃতিটি চিরদিনের জন্য হাজিদের দ্বারা অমস্নান ও স্মরণীয় করে দেন। আর হজের এই কাজটি ওয়াজিব হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। মা হাজেরা উভয় পাহাড়ে সাতবার দৌড়াদৌড়ি করে নিরুপায় হয়ে সন্তানের কাছে ফিরে এসে দেখতে পেলেন যে, ইসমাইলের পাদদেশে পানি। বিবি হাজেরা তাড়াতাড়ি দৌড়ে গেলেন শিশুপুত্রের কাছে। হ্যাঁ ঠিকই পানি। শিশুপুত্রের খেলাচ্ছলে পায়ের গোড়ালির আঘাতে আঘাতে প্রস্তর চুইয়ে পানি আসছে। আল্লাহপাকের শুকরিয়া আদায় করে পানি যাতে গড়িয়ে যেতে না পারে তাই আশপাশ থেকে প্রস্তর ও বালু এনে চারপাশে বৃত্তাকারে পানি যতদূর গড়িয়েছে ততটুকু বাঁধ দিয়ে আটকালেন এবং পানিকে জমজম অর্থাৎ থামথাম বললেন। অমনি আল্লাহপাকের নির্দেশে পানি স্থির হয়ে রইলো। বর্ণিত আছে যে, সেদিন যদি তিনি পানিকে এভাবে বাধা প্রদান না করতেন, তবে এ পানিতেই সারাবিশ্ব তলিয়ে যেত। জমজম কূপের উৎপত্তির দিন থেকে মক্কা নগরীতে জনবসতির সূচনা হয়। ধীরে ধীরে তা মহানগরীতে পরিণত হয়। এর পানি বিশ্বের সর্বোত্তম এবং বিশেষ বরকতময়। 

জমজম কূপ সম্মন্ধে কিছু জানা-অজানা তথ্য:

 ১) আল্লাহ তা'লার অসীম কুদরতে ৪০০০ বছর পূর্বে সৃষ্টি হয়েছিল। এরপর থেকে… এর স্বাদেরও কোন পরিবর্তন হয় নাই আজ পর্যন্ত কোন এলগি বা শ্যাওলা জন্মায় নাই কোনরকম জীবাণুরও সংক্রমন হয় নাই পৃথিবীর বিভিন্ন হাই টেক ল্যাবোরেটরিতে এর মান ও গুণাগুণ পরীক্ষা করা হয় এবং তাতে কোনরকম সমস্যা পাওয়া যায় নাই আজ পর্যন্ত
২) ভারী মোটরের সাহায্যে প্রতি সেকেন্ডে ৮০০০ লিটার পানি উত্তোলন করার পরও পানি ঠিক সৃষ্টির সূচনাকালের ন্যায়। আর পানি উঠানো বন্ধের পর মাত্র ১১ মিনিটে আবার পানির লেভেল উঠে আসে ১৩ ফুটে! এখন একটা স্বাভাবিক গাণিতিক হিসাবে যাওয়া যাক। প্রতি সেকেন্ডে ৮০০০ লিটার হিসাবে ২৪ ঘণ্টায় উত্তোলিত পানির হিসাব দাড়ায়- ৮০০০*৬০*৬০*২৪= ৬৯১.২ মিলিয়ন লিটার! যা পূরণ হয়ে যায় মাত্র ১১ মিনিটে অথচ তা তোলা হয়েছিল ২৪ ঘণ্টায়!! সুবহানআল্লাহ 
৩) দুটো আশ্চর্য ব্যাপার এখানে যে- জমজম কূপের এত দ্রুত পূর্ণ হয়ে যাওয়া বা কুপে পানি প্রবাহের এত তীব্র গতি আবার অন্যদিকে সেই তীব্র গতির পানিপ্রবাহ একটা নির্দিষ্ট মাত্রায় এসে বন্ধ হয়ে যাওয়া আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সৃষ্টি অসাধারন এবং চমৎকার তাঁর নিয়ন্ত্রণ।
৪) এই কূপের পানি সৃষ্টির পর থেকে একই রকম আছে এর পানি প্রবাহ, এমনকি হজ্ব মউসুমে ব্যবহার ক'য়েক গুন বেড়ে যাওয়া সত্বেও এই পানির স্তর কখনও নিচে নামে না।
৫)  সৃষ্টির পর থেকে এর গুনাগুন, স্বাদ ও এর মধ্যে বিভিন্ন উপাদান একই পরিমানে আছে।
৬) এই কূপের পানির মধ্যে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম সল্ট এর পরিমান অন্যান্য পানির থেকে বেশী, এজন্য এই পানি শুধু পিপাসা মেটায় তা না, এই পানি ক্ষুধাও নিবারণ করে।
) এই পানিতে ফ্লুরাইডের পরিমান বেশী থাকার কারনে এতে কোন জীবানু জন্মায় না ।
৮) এই পানি পান করলে সকল ক্লান্তি দূর হয়ে যায়।
৯) সব থেকে বড় নিদর্শন হলো এই কূপের কোন সংযোগ নেই, কারণ আসে পাশে নেই কোন জলাধার বা নদী বা সমুদ্র, সম্পূর্ণ মরুভূমি, আর বৃষ্টি… তা তো নেই বললেই চলে! আলহামদুলিল্লাহ, এটাই আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি নিদর্শন আমাদের জন্য
►রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জমজমের পানি যে যেই নিয়তে পান করবে, তার সেই নিয়ত পূরণ হবে। যদি তুমি এই পানি রোগমুক্তির জন্য পান কর, তাহলে আল্লাহ তোমাকে আরোগ্য দান করবেন। যদি তুমি পিপাসা মেটানোর জন্য পান কর, তাহলে আল্লাহ তোমার পিপাসা দূর করবেন। যদি তুমি ক্ষুধা দূর করার উদ্দেশ্যে তা পান কর, তাহলে আল্লাহ তোমার ক্ষুধা দূর করে তৃপ্তি দান করবেন। এটি জিবরাইল (আ.)-এর পায়ের গোড়ালির আঘাতে হজরত ইসমাইল (আ.)-এর পানীয় হিসেবে সৃষ্টি হয়েছে।’ (ইবনে মাজাহ ও আল-আজরাকি)

►জম জমের পানি দাড়িয়ে এবং তিন শ্বাসে পান করা সুন্নাহ। পান করার সময় নিম্নের দোয়াটি পাঠ করা-
اللَّهُمَّ إِنِّى أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا, وَرِزْقًا وَاسِعًا, وَشِفَاءً مِنْ كُلِّ دَاءٍ.
(حديث ضعيف/ رواه الدارقطنى وعبد الرزاق والحاكم عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا مَوْقُوْفًا)

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আস'আলুকা ইলমান নাফি'আ, ওয়ারিজকান ওয়াসিয়া, ওয়াশিফা'আন মিন কুল্লি দা।

অর্থ: হে আল্লাহ, আমি আপনার নিকট কল্যাণকর জ্ঞান, প্রশস্থ রিযিক এবং যাবতীয় রোহ থেকে আরোগ্য কামনা করিতেছি। (দারা কুতনী, আব্দুর রাজ্জাক ও হাকেম, বর্ণনায় ইবেনে আব্বাস)
বৈজ্ঞানিক গবেষণায় জমজমের পানি
- গবেষক তারিক হোসাইন, রিয়াদ এবং মইনুদ্দিন আহমেদ 
বাংলা লিখেছেন

আব-ই-জমজম কূপ আল্লাহর সৃষ্ট এক বিস্ময়কর নিদর্শন। ১৯৭১ সালে একজন মিশরীয় ডাক্তার ইউরোপীয়ান গণমাধ্যমে লিখে ছিলেন, জমজমের পানি পানের উপযোগী নয়। কাবার অবস্থান ছিল সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে নিচে এবং মক্কার মাঝখানে। তাই শহরের সকল নোংরা পানি এই কূপে এসে জমা হয়। এই খবরটি সৌভাগ্যক্রমে বাদশাহ্ ফয়সলের দৃষ্টি গোচর হয় এবং তিন চরম রাগান্বিত হন। তিনি কৃষি ও পানি সম্পদ মন্ত্রণায়কে দ্রুত নির্দেশ দিলেন এর তদন্ত করতে। মন্ত্রণালয় জেদ্দার পাওয়ার এন্ড ডিজএলাইজেশন প্লান্টকে নির্দেশ দিল এই কাজটি করতে। তখন আমি (লেখক) সেই প্রতিষ্ঠানে ক্যামিকেল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত ছিলাম। আমি এই কাজটি করতে আগ্রহ দেখালাম। প্রথমে আমি কূপটির আয়তন সম্পর্কে ধারণা নিতে শুরু করলাম। আমি আমার সহকারীকে গোসল করিয়ে পবিত্র করে কূপে নামালাম। 

সহকর্মীর উচ্চতা ছিল ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি। কূপের পানি তার কাধ পর্যন্ত ছিল। কূপটির আয়তন ১৮ ফুট বাই ১৪ ফুট। সে কূপের এক প্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে খুজে কোথাও কোন অর্ন্তনালী বা পাইপলাইন পেল না। আমার মাথায় অন্য একটি বুদ্ধি খেলল। আমি একটি উচ্চ মতা সম্পন্ন পাম্প বসিয়ে দ্রুত কূপের পানি সেচতে থাকলাম। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে পানির লেভেলে কোন পরিবর্তন ঘটল না। এটা ছিল একটি পদ্ধতি যার মাধ্যমে কোথা থেকে পানি কূপে আসছে তা বের করা যেত। আমি এই পদ্ধতি পুনরায় প্রয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি সহকারীকে এবার কূপে নামিয়ে তাকে সূক্ষ্ম ভাবে পর্যবেনের নির্দেশ দিয়ে পাম্প চালু করলাম। এবার একটি অবাক করা ঘটনা ঘটল। সে হঠাৎ তার হাত তুলে চিৎকার করে বলে উঠল, “আলহামদুলিল্লাহ! আমি পেয়েছি। আমার পায়ের নিচে বালি নাচছে।” তারপর সে কূপের চারদিকে হাটতে শুরু করল এবং দেখল সব স্থানে একই ঘটনা ঘটছে। 

আসলে কূপের সব স্থান থেকে একই গতিতে পানি এসে সমতা বজায় রাখছিল। আমার এই পর্যবেণ শেষে আমি পানির নমুনা পরীার জন্য ইউরোপীয়ান ল্যবরেটরীতে পাঠালাম। আমি মক্কার অন্যান্য কূপগুলো সম্পর্কে খবর নিলাম। দেখলাম সেগুলো সচরাচর শুকনো থাকে। ইউরোপীয়ান ল্যাবেরটরীজ তাদের পরীা শেষে রিপোর্টে জানালো সাধারন পানির তুলনায় জমজমের পানিতে ক্যালশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম সল্টের পরিমাণ বেশী। যা হাজীদের কান্তি দূর হওয়ার জন্য একটি কারণ হতে পারে। ল্যাবেরটরীজ এই পানিকে পানের উপযোগী বলে আখ্যায়িত করে। বাদশাহ্ ফয়সল একথা শোনার পর অনেক খুশি হলেন এবং পূর্বের রিপোর্টটির একটি প্রতিবাদ ইউরোপীয়ান গণমাধ্যমে পাঠালেন। উল্লেখ্য, ছোট এই কূপটি লক্ষ লক্ষ মানুষের পানির চাহিদা মিটিয়ে আসছে। একটি পরীক্ষায় দেখা গিয়েছিল এখান থেকে আধুনিক পাম্পের মাধ্যমে প্রতি সেকেন্ডে ৮ হাজার লিটার পানি উত্তোলন করা যায় এবং ২৪ ঘন্টা পর ১১ মিনিটের জন্য বিরতী দেয়া হলে পানির লেভেল আবার সমান হয়ে যায়। জমজম কূপের পানির স্তর কখনো কমে না। এতে কখনো শ্যাওলা বা আগাছা জন্মে না।  

Post a Comment