ব্যাংকে রাখা আপনার টাকা যেভাবে নিমিষেই হ্যাক হতে পারে


আপনার ক্রেডিট কার্ড বা ডেবিট কার্ডের তথ্য ব্যবহার করে বিভিন্নভাবে আপনার টাকা হাতিয়ে নেওয়াকে কার্ডিং বলে। কার্ডিং শব্দটা সাধারণত ব্যবহৃত হয় যারা এই কাজ করে তাদের মধ্যে সাংকেতিক ভাষা হিসাবে।


আমাদের ব্যাংকিং খাত আস্তে আস্তে উন্নত হচ্ছে। আর এর সেবা দ্রুত থেকে দ্রুততর করার জন্য টেকনোলজির মাধ্যমে ইলেক্ট্রিক মানি তৈরি করে আমরা টাকা দ্রুততার সাথে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে পাঠাচ্ছি। আর এর মাধ্যমেই কিছু অসাধু লোক এই সিস্টেমগুলোর বিভিন্ন ত্রুটি কাজে লাগিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার। সম্প্রতি ফিলিপাইনে বাংলাদেশের ১০০ মিলিয়ন ডলার ট্রান্সফার হওয়াতে ব্যাপারটা নিয়ে অনেকেই আলোচনা করছেন। কিন্তু কীভাবে করে? কার মাধ্যমে টাকা তোলে এইগুলো অনেকের অজানা। এইগুলো নিয়ে আলোচনার একটা ছোট্ট প্রয়াস হচ্ছে এই লেখাটা।

কার্ডিং কি?
কার্ডিং শব্দটা অনেকের কাছে নতুন মনে হতে পারে। আসলে কার্ডিং একটা প্রচলিত শব্দ। আপনি কোনো অভিধানে এই শব্দ পাবেন না। এই শব্দটা সাধারণত ব্যবহার হয় অনলাইন ফ্রড ট্রানজেকশন-এর বিকল্প হিসাবে। কারণ যারা ফ্রড ট্রানজেকশন করে তারা আপনার কার্ডের ইনফরমেশন চুরি করে বিভিন্ন অনলাইন স্টোরের মাধ্যমে পণ্য কিনে আপনার টাকা তার নিজের মনে করে ব্যবহার করে।

অর্থাৎ আপনার ক্রেডিট কার্ড বা ডেবিট কার্ডের তথ্য ব্যবহার করে বিভিন্নভাবে আপনার টাকা হাতিয়ে নেওয়াকে কার্ডিং বলে। কার্ডিং শব্দটা সাধারণত ব্যবহৃত হয় যারা এই কাজ করে তাদের মধ্যে সাংকেতিক ভাষা হিসাবে। আমাদের প্রচলিত ভাষায় ‘ফ্রড ট্রানজেকশন’।

আপনার কার্ডের তথ্য পায় কীভাবে?
এটা একটা বড় প্রশ্ন। অনেকেই বলে আমার কার্ডের তথ্য পায় কীভাবে? আমি তো বাংলাদেশে থাকি একজন আফ্রিকা থেকে আমার তথ্য পায় কীভাবে? তাহলে ব্যাংকিং সিস্টেম কী নিরাপদ না? আপনার তথ্য কি ব্যাংকের কাছে নিরাপদ না। হাজার হাজার আইটি সিকিউরিটি প্রফেশনাল কী করেন? এই সবগুলোর উত্তর আমি দিচ্ছি ও বলে দিচ্ছি কীভাবে আপনার তথ্য তাদের কাছে চলে যায়?

আপনার সব তথ্য ব্যাংকের কাছে নিরাপদ। তারা লাখ লাখ ডলার বিনিয়োগ করছে আপনাকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য। এবং তাদের সিস্টেমগুলো যথেষ্ট নিরাপদ। তারা কোনো পাবলিক হোস্টিং কোম্পানি থেকে সার্ভার স্পেস ভাড়া নেয় না, যাতে সার্ভার কোম্পানির থ্রুতে আপনার তথ্য ফাঁস না হতে পারে। তাদের পুরো সার্ভার নিজেদের কন্ট্রোলে থাকে ও নিজেদের ইনফ্রাস্ট্রাকচারে থাকে এবং ফিজিক্যাল সিকিউরিটি যথেষ্ট থাকে। সফটওয়ারে সিকিউরিটিও থাকে। এরপরেও অনেক উচ্চ মানের হ্যাকার হলে সেটাও হ্যাক করা যেতে পারে।

বাংলাদেশে সম্প্রতি যে সকল এটিএম কার্ডের কেলেংকারি হয়েছে তা ফিজিক্যাল সিকিউরিটির অভাবে। মানে একজন এসে এটিএম বুথে স্কিমিং ডিভাইস বসিয়ে গেল আর আপনি দেখলেন না, এটা তো একেবারেই বাচ্চাদের মতো কাজ। তাই সার্ভারের নিরাপত্তার জন্য ফিজিক্যাল সিকিউরিটি ও সফটওয়্যার সিকিউরিটি সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তাহলে ব্যাংকে যেহেতু তাদের সার্ভারের ফিজিক্যাল ও সফটওয়্যার পুরো নিরাপত্তা দিয়েছে তাহলে কীভাবে আমার তথ্য কার্ডিং যারা করে তাদের হাতে চলে যায়?

এর একটা সাধারণ উত্তর হচ্ছে, এর জন্য আপনি দায়ী।

খুবই কম ক্ষেত্রে আপনি যদি আপনার কার্ডের তথ্য কাউকে না দেন তাহলে ব্যাংকের ডাটাবেইজ থেকে সরাসরি কার্ডারদের হাতে চলে যাওয়ার চান্স থাকে। তাহলে কীভাবে যায়?

এটার উত্তর হচ্ছে আপনি কোনো না কোনোভাবে আপনার কার্ডের তথ্য তাদের দিচ্ছেন। আসুন জেনে নিই কীভাবে দিচ্ছেন আপনার কার্ডের তথ্য। তার আগে জেনে নিই আপনার কার্ডের কতটুকু তথ্য তাদের হাতে থাকলে আপনার কার্ড যে কেউ ব্যবহার করতে পারে। এই জন্য আপনাকে একটা কার্ডের ছবি দেখাই।

এখানে কার্ডের সামনে যে ১৬ ডিজিটের নম্বর দেখতে পারছেন সেটা আপনার কার্ডের নম্বর। এখানে কার্ডের মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ, কার্ডধারীর নাম থাকে। আর বিপরীতে যে একটা নম্বর দেখতে পারছেন তার শেষ তিনটা নম্বরকে সিভিভি (CVV) নম্বর বলে। আপনার কার্ডের যদি কার্ড নম্বর, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ, কার্ডধারীর নাম, সিভিভি নম্বর কারো কাছে চলে যায়, তাহলে সে তার নিজের মতো কার্ড ব্যবহার করতে পারবে।

এই ইনফরমেশন কিভাবে পায় আপনার কাছ থেকে?

১। কোনো ফিসিং সাইট থেকে: এই ধরনের সাইটগুলো সাধারণত কোনো সোস্যাল মিডিয়ার বা মেইলের মাধ্যমে লিংক ছড়ায়। জিনিসগুলোয় থাকে কোনো অফার। যেমন আপনাকে কোনো চার্জ করা হবে না। শুধু আপনার ক্রেডিট কার্ড নম্বর দিন আমরা আপনাকে যাচাই করার জন্য আপনার ক্রেডিট কার্ডের তথ্য চাচ্ছি, এইসব মন ভুলানো কথাবার্তা বলে আপনার কার্ডের তথ্য তাদের ডাটাবেইজে নিয়ে নেয়।

২। পর্ন সাইট থেকে: এই সাইটগুলোতে বিভিন্ন ভিডিও আপলোড করা থাকে এরপর প্রথম ১ মিনিট আপনাকে পর্নো মুভি দেখিয়ে বলবে পুরো মুভি দেখতে আমাদের এখানে নিবন্ধন করুন। যখনই আপনি নিবন্ধন করতে যাবেন আপনার তথ্য চাইবে আর দিলেই পুরো তথ্য তাদের হাতে চলে যায়।

৩। ডেটিং সাইট: আমেরিকা, কানাডা, সিংগাপুর থেকে শুরু করে অনেক দেশেই এখন ক্লাসিফাইড এড সাইট খুবই জনপ্রিয়। এটা অনেকটা আমাদের দেশের বিক্রয় ডট কমের মতো। এ সব সাইটে একটা পারসোনাল এরিয়া আছে, যেখানে ছেলেরা গার্ল ফ্রেন্ড খোঁজার জন্য এড দেয় আর মেয়েরা বয় ফ্রেন্ড খোঁজার জন্য এড দেয়। যেমন ক্রেইগ লিস্ট, ব্যাক পেইজ। এইসব সাইটে স্কামাররা ফেসবুক, লিংকড ইন অথবা বিভিন্ন পর্নো সাইট থেকে সুন্দরী মেয়েদের ছবি নিয়ে এড দেয়। বলে আমি একজন বয় ফ্রেন্ড খুঁজছি, কেউ যদি আমার সাথে ডেট করতে চাও আমাকে রিপ্লাই করো এই এডে। পরে ছেলেরা সুন্দর মেয়ের ছবি দেখে সেখানে রিপ্লাই করে আর রিপ্লাই করলেই বলে তুমি ১৮+ কিনা তা যাচাই করতে এখানে সাইন আপ করো। সেখানে থাকে একটা ল্যান্ডিং পেইজ। সেখানে সাইন আপ করতে গেলেই আপনার ক্রেডিট কার্ড তথ্য চায়। আর দিলেই তারা পেয়ে যায় আপনার পুরো তথ্য।

৪। জব সাইট: আমেরিকায় জব পাওয়া একটা বিশাল বড় জিনিস। জবের প্রচুর ক্রাইসিস থাকে। অনেকেই ক্রেইগ লিস্টে, ব্যাক পেইজে বিভিন্ন এড দেয় জবের। সেই জব করতে গেলে তাদের সাইন আপ করতে বলে একটা লিংকে। সেই লিংকে বলে তোমাকে জিরো পেমেন্ট করতে হবে কিন্তু তোমার ক্রেডিট কার্ডের তথ্য দিতে হবে, যাতে আমরা তোমাকে যাচাই করতে পারি। যখনই আপনার ইনফরমেশন তাদের দিবেন, সাথে সাথে আপনার তথ্য সব পেয়ে যাচ্ছে।

৫। ই-কমার্সে: আপনি হয়তো কোনো ভালো সফটওয়ারে খুঁজছেন, যা আপনার দুই দিনের জন্য দরকার। এই সময় গুগলে সার্চ দিলেন। গুগলে সার্চ দিলে দেখছেন এই সবগুলো সফটওয়্যারে পেইড। কোনো ফ্রি নাই। এর মধ্যেই কিছু লিংক পাবেন যারা বলবে আমরা তোমাকে ৩০ দিনের ট্রায়াল দিব। কিন্তু তোমাকে ক্রেডিট কার্ড ইনফরমেশন দিতে হবে। আর ইনফরমেশন দিলেই আপনার সব তথ্য তাদের কাছে চলে যাবে। আর চলে গেলেই আপনার সব শেষ। এ ছাড়া অনেকেই অনেক প্রকার ফেক ই-কমার্স বানিয়ে রাখে ও SEO করে তাদের সাইট টপে আনে নির্দিষ্ট কী-ওয়ার্ডের এগেইনেস্টে। ধরেন আপনি ভালো মানের এনড্রয়েট ডিভি বক্স চাচ্ছেন। গুগলে সার্চ দিলেন। একটা ভালো সাইট দেখতে পেলেন। অর্ডার দিলেন ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে। সাথে সাথে আপনার সব তথ্য তারা পেয়ে গেল।

আসলে এভাবেই আপনার ইনফরমেশন কার্ডাররা পেয়ে থাকে।

আর যারা এই কাজ করে তারা সুসংগঠিত একটা গ্রুপ, তারা এই তথ্য প্রতিদিন অন্তত ২ থেকে ১০ হাজার সংগ্রহ করে। এতগুলো কার্ডের তথ্য নিয়ে তারা কিন্তু নিজেরা এই কার্ড ব্যবহার করে না। তাহলে তারা কী করে?

তাহলে যারা আপনার কার্ডের ইনফরমেশন চুরি করছে আপনাকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে তারা কী করছে এত বিশাল পরিমাণ তথ্য দিয়ে।

আসলে যারা এই কার্ডের তথ্য চুরি করে তারা কেউ এই তথ্য ব্যবহার করে না। তারা এগুলো বিক্রি করে দেয়। ২ ডলার থেকে শুরু করে প্রায় ১০০ ডলার পর্যন্ত এই কার্ডগুলো বিক্রি হয়। আর সেকেন্ড লেয়ারের কার্ডাররা সেগুলো তাদের প্রায়োজন মতো কিনে নেয়।

কোথায় বিক্রি হয় এই কার্ড?

আপনি চমকে যাবেন যে, এই কার্ডগুলো বিক্রির জন্য রীতিমতো কিছু অনলাইন শপ আছে। তাদের মধ্যে কিছু দিচ্ছি আমি-
১। http://ug4all.ru/
২। https://www.basecard.ru/
৩। https://jshop-net.cc/login/
৪।https://ccbox.su/Login.php

এইগুলো কিছু উদাহরণ। এই সাইটগুলোয় আপনি একটা নরমাল মেইল দিয়ে সাইন আপ করে দেখতে পারেন যে, কীভাবে সেখানে আপনার কার্ডের বাণিজ্য হচ্ছে। এইগুলো সাধারণত হ্যাকারদের মার্কেটপ্লেস।

আপনার কার্ডিং জ্ঞান শেয়ারিং ও ব্রেইন স্ট্রর্মিং-এর জন্য হাজার হাজার ফোরাম আছে, ফেসবুক গ্রুপ আছে। যারা নিয়মিত কার্ডিং-এর ব্যাপারে মানুষের সাথে ফ্রড করতে আলোচনা করে। আর তাদের মেইন কারেন্সি হচ্ছে বিট কয়েন ও পারফেক্ট মানি। এই কারেন্সিগুলো দিয়ে তারা কার্ডের তথ্য লেনদেন করে। এমন-কি তারা নিজেদের মধ্যেও ফ্রড করে। মানে একজন বলল আমার কাছে ২০০ কার্ডের তথ্য আছে। আরেকজন কিনতে চাইল। বিট কয়েনে তারা টাকা দিল, দেওয়ার পর আরেকজন উধাও। এইজন্য আসলে মার্কেটপ্লেসগুলো গড়ে উঠেছে।

কি আপনার গা শিউরে উঠছে ইন্টারনেটে এত বড় কালো জগত? জ্বি, আরো আছে। চলুন পরবর্ত ধাপে।

এই কার্ডের তথ্যগুলো দিয়ে কী করে কার্ডাররা?

সাধারণত এই তথ্যগুলো ব্যবহার করে জুয়া খেলা হয় আর সেখান থেকে টাকা তুলে নেওয়া হয়। এ ছাড়া হাজারও রকমের কাজ হয়। চলুন তালিকা দেখি-

১। অনলাইন জুয়া।

২। অনলাইনে কোনো সফটওয়্যারে কেনা।

৩। এক মেথড থেকে আরেক মেথডে ট্রান্সফার করে। যেমন হচ্ছে ক্রেডিট কার্ড ইনফমেশন পেল, এর পর সেই ক্রেডিট কার্ডের তথ্য ব্যবহার করে আরেকটা পেপাল একাউন্ট খুলল। এর পর সেই পেপাল দিয়ে কেনাকাটা করল।

৪। এফিলিয়েট করে: এটা একটা ইন্টারেস্টিং জিনিস। বিভিন্ন এফিলিয়েট কোম্পানির পণ্য বিক্রি করলে তারা বড় এমাউন্টে আপনাকে কমিশন দেয়। যেমন ক্লিক সিউর নামের একটা প্রতিষ্ঠান আছে যারা তাদের ৫০০ ডলারের একটা পণ্য বিক্রি করে দিলে আপনাকে ২৫০ ডলার কমিশন দেয়। তো আপনি কার্ড চুরি করে আপনার এফিলিয়েট লিংকে গিয়ে আপনি নিজেই প্রডাক্টটা কিনলেন তখন আপনার একাউন্টে ২৫০ ডলার ঢুকে গেল। এই ক্ষেত্রে আপনি কার্ড কিনেছিলেন ১০ ডলার দিয়ে। নিট প্রফিট ২৪০ ডলার। এভাবে অনেকেই এই কার্ডের ইনফরমেশন ব্যবহার করে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

৫। এডাল্ট এফিলিয়েট করে: অনেক পর্নো সাইট আছে বা ডেটিং সাইট আছে, যারা তাদের পণ্য বিক্রি করে দিলে, মানে তাদের মেম্বার বানিয়ে দিলে ৩০ থেকে ৪০ ডলার কমিশন দেয়। সো এই ক্ষেত্রে কার্ডাররা নিজেদের লিংক থেকে নিজেরাই কিনে এর পর কমিশন নেয়। যেমন ধরেন আপনি ১০০ ডলার দিয়ে ১০টা কার্ড কিনলেন। এর পর আপনি সেই কার্ড দিয়ে ৫টা এডাল্ট এফিলিয়েট কোম্পানির মেম্বার হলেন। তাহলে আপনার কমিশন ৫x১০x৪০= ২০০০ ডলার। আর এ জন্য আপনাকে খরচ করতে হয়েছে মাত্র ১০০ ডলার। আপনার এই ক্ষেত্রে কার্ড হ্যাকিং করা জানতে হবে না। ক্রেডিট কার্ড শপ থেকে কার্ড কিনেই এই কাজ করতে পারেন।

৬। ফ্লিপ কার্ট, এমাজান, ওয়ার্ল মার্ট, টিস্প্রিং সাইট থেকে পণ্য কেনা: অনেকেই সরাসরি ফ্লিপ কার্ট, এমাজান, ওয়ার্ল মার্ট, টিস্প্রিং এর মতো সাইট থেকে পণ্য কিনে তার নিজ নিজ দেশেই শিপ করে। এই ক্ষেত্রে কে এই কাজ করছে তা বের করা সহজ হওয়ার কথা, বাট হয় না। কারণ তারা যেই তথ্য ব্যবহার করে তা ফেক।

৭। বিভিন্ন লোড: ফ্লেক্সি লোডের মতো মোবাইলে অনলাইনে লোড করে বিভিন্নভাবে টাকা আনা যায়।

৮। এভিয়েশনে: ধরেন আপনি ঢাকা টু কলকাতা যাবেন। একজন বলল ভাই আমাকে ২ হাজার টাকা দিয়েন আমি আপনার টিকিট কেটে দিব। আপনি তো খুশিতে লাফাবেন। যেখানে সাধারণত ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা লাগে সেখানে ২ হাজারে টিকিট। দেখা যাচ্ছে আপনাকে সত্যি সত্যিই তারা ২ হাজারে টিকিট দিল এবং সেই টিকিট দিয়ে কলকাতাতে ঘুরে বেরাচ্ছেন। আসলে ঐ ছেলেটা আরেকজনের কার্ড ১০ ডলারে কিনে আপনার টিকিট কেটে দিয়েছে। আর আপনার থেকে ২ হাজার টকায় বিক্রি করল নিট লাভ ১২০০ টাকা।

৯। হোটেল/অনলাইন ফুড: অনেক হোটেল ও অনলাইনে খাদ্য কেনা যায়। যাদের আপনি অনলাইনেই সব পেমেন্ট করতে পারেন। এই অনলাইনে তারা মানুষের কার্ড দিয়ে হোটেলে থাকছে ও বিভিন্ন ফুড কোম্পানি যেমন ফুড পান্ডার মতো কোম্পানি থেকে খাবার এনে খাচ্ছে।

১০। ফ্রি-ল্যান্সিং সাইটগুলো থেকে: এটা অনেকেই করে। একজনের কার্ড ব্যবহার করে ক্লাইন্ট সেজে কাজ দেয় নিজেকে। এর পর সেখান থেকে কাজ দিয়ে সে কাজ কমপ্লিট করে। আর এই পাশ থেকে টাকা তুলে নেয়।

এবার তো দেখলেন আপনার কষ্টে অর্জিত টাকা ব্যাংকে রেখে সিকিউর ভাবছেন, আর আয়েশ করে কার্ডাররা কীভাবে আপনার তথ্য ব্যবহার করে বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করছে।

আসুন জেনে নেই কারা করে এই কাজ :
এই কাজের সাথে যুক্ত অনেকেই।হ্যাকিং-এর পার্টটা রাশিয়া, ইউক্রেন, রোমানিয়াসহ ওই রিজনের ছেলেমেয়েরা করে। এবং কার্ডের ইনফরমেশন বিক্রি করেই তারা খ্যান্ত যায়। তাদের মেধা অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি।

এর পর সেই কার্ড কিনে বিশেষ করে আফ্রিকার নাইজেরিয়া, সাউথ আফ্রিকা, সোমালিয়া থেকে শুরু করে ওই রিজনের দেশগুলোর ছেলেমেয়ে এই কাজে গুরু। এশিয়ান রিজনের সবচাইতে বেশি হয় থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, ভারত, পাকিস্তানে। এছাড়া খুবই দুঃখের ব্যাপার বাংলাদেশে অন্তত ২০০ ছেলেমেয়ে এই কাজ নিয়মিত করতেছে। এবং তারা খুবই স্বল্প সময়ে অনেক টাকার মালিক হয়ে গেছে। তাদের জিজ্ঞেস করলে বলে, আমরা ফ্রিল্যান্সিং করি।

বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা যারা কার্ডিং করে তারা মূলত কিসে কিসে কার্ডিং করে?
বাংলাদেশে এখন ফ্রিল্যান্সিং-এর জোয়ার বইছে। তার সাথে এফিলিয়েট মার্কেটিং এর বিশাল প্রসার হচ্ছে। বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা যারা কার্ডিং পারে তারা মূলত ৪ টা কাজ করে।

১। ফ্রিল্যান্সিং মার্কেট প্লেসের মাধ্যমে নিজের কেনা কার্ড দিয়ে ক্লাইন্ট সেজে কাজ দেয় ও নিজেরা সেই কাজ কমপ্লিট করে টাকাগুলো তাদের একাউন্ট নিয়ে নেয়।

২। এফিলিয়েট মার্কেটিং ও এডাল্ট এফিলিট করে তারা বিভিন্ন প্রডাক্ট তাদের এফিলিয়েট লিংকের মাধ্যমে কিনে সেটার কমিশন তারা নিজের একাউন্টে নেয়।

৩। মোবাইল রিচার্জ, বাংলালায়ন, কিউবির রিচার্জ করে ইনকাম করে। এরা কালোবাজারি করে। যেমন আপনার ১৫০০ টাকার প্যাকেজের লোড করে দিবে ১০০০ টাকায়। এতে আপনিও হ্যাপি তারাও হ্যাপি।

৪। বিমান টিকিট কেটে। রিজেন্ট, ইউএস বাংলা থেকে শুরু করে অনেক ডমিস্টিক এয়ার লাইন অনলাইনে টিকিট কাটার সুযোগ দেয়। এরা এই টিকিটগুলো কেটে বিক্রি করে খুবই কম দামে। যেমন আপনি মাত্র ২০০০ টাকায় ঢাকা টু কক্সবাজার টু ঢাকার টিকেট পাবেন এদের কাছে।

কোন কোন দেশি কোম্পানি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, হচ্ছে কিন্তু নিজেরা টেরও পাচ্ছে না
আমার জানা মতে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে সূর্য পেই ও এসএসএল কমার্স। শুধু সূর্য পেই থেকেই কোটি কোটি টাকার লোড করা হয়েছে। আমাকে কয়েকজন ফেসবুক মারফতে ১০০০ টাকার লোড ৭০০ টাকায় করে দিতে চেয়েছিল। আমি তাদের পুলিশে দিব বলাতে আমাকে ব্লক মারছে। এছাড়া ইজি ডট কম ডট বিডির মাধ্যমেও তারা এই কাজ করে। তবে রিসেন্টলি তারা মনে হয় ইন্টারন্যাশনাল কার্ডের মাধ্যমে পেমেন্ট স্ট্রিক করে ফেলছে। এছাড়া এয়ার টিকিটগুলো দেদারসে করছে। একদিন হয়তো দেখা যাবে বাংলাদেশের বিমান পরিবহন ব্যবস্থায় ১০০ মিলিয়ন ফ্রড ট্রানজেকশন। তখন কিছুই করার থাকবে না।

ভাই বলেন কী! আমার তো শরীর শিউরে উঠছে এইগুলো পড়ে। প্রতিকারের উপায় কী? জ্বি ভাই শরীর শিউরে উঠারই কথা। বাংলাদেশে যারা কার্ডিং করছে তারা অন্য দেশের কার্ড কিনে করছে। কিন্তু আপনার কার্ড যে অন্য আরেক দেশের ছেলেমেয়ে কার্ডিং করবে না এর গ্যারান্টি কী? জ্বি ভাই বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা যারা করে, তারা প্রায় বিনা বাধায় করছে। কারণ বাংলাদেশের র‌্যাব, পুলিশ, এমন-কি মিলিটারিও এই জিনিস জানে না। অনেক ফোর্স তো কল্পনাও করতে পারে না। কিন্তু এরাই দেশের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দাতা। এদের অস্ত্রের ট্রেনিং থাকতে পারে কিন্তু এইগুলো ধরার কোনো ট্রেনিং নাই। ইভেন আপনি পুলিশকে এইসব বিষয় নিয়ে অভিযোগ করলে পুলিশ বুঝতেও পারবে না। কারণ তাদের এই বিষয় নিয়ে কোনো ট্রেনিং নাই। তারা জানেও না বুঝেও না।

তাহলে করার কী উপায়?

আছে ভাই উপায় আছে। নিম্নোক্ত দাওয়ায় গ্রহণ করলে আপনার কার্ড একেবারে নিরাপদ থাকবে।

১। আপনার ক্রেডিট কার্ড ডেবিট কার্ড কাউকে দেখাবেনও না। ইভেন কার্ড দেখতে কেমন উল্টে-পাল্টে দেখাবেনও না। নিজের ছেলেমেয়ে স্ত্রীকেও দেখাবেন না।

২। অনলাইনে কেনাকাটার জন্য ক্যাশ অন ডেলিভারি সার্ভিস ব্যবহার করবেন। কোনো পেমেন্ট আগে দিবেন না।

৩। নিজের চরিত্র ভালো করুন। কোন পর্নো সাইট বা ডেটিং সাইটে ঢু মারার প্রায়োজন নাই। যদি পর্নো দেখতেই হয় তার আগে বিয়ে করে ফেলুন। ধর্মীয় নিয়ম কানুন মেনে চলুন।

৪। কোনো সফটওয়ারের ট্রায়াল লাইসেন্স ব্যবহার করবেন না। যারা ট্রায়াল দেওয়ার জন্য ক্রেডিট কার্ড চায় তাদের সার্ভিস এড়িয়ে চলুন।

৫। নিজের কম্পিউটারে শক্তিশালী এন্টিভাইরাস লাগান। ভাইরাস ও ম্যালওয়ার মুক্ত রাখুন।

৬। অনলাইনে কিছু কিনতে হলে দেখে নিন, সেই সাইটে SSL লাগানো আছে কি না। এসএসএল লাগানো থাকলে চেনার উপায় আপনার ব্রাউজারে www-এর আগে https:// থাকবে গ্রিন কালারে। কিন্তু SSL না থাকে http:// থাকবে। এস-টা থাকবে না।

ভাই আপনি এত কিছু জানলেন ক্যামনে? আপনি কি কার্ডিং করেন?
হা হা হা! জ্বি না ভাই আমি কার্ডিং করি না। আমি একজন ই-কমার্স ওয়েব ডেভলপার। আমার webeeo soft নামের একটা কোম্পানি আছে খিলক্ষেতে। একদিন অফিসে এসে চা খেয়ে যেতে পারেন। আসলে আমি প্রায় ৩০ টা ই-কমার্স সাইটের মেইন্টেন্যান্স করি। আর এই পর্যন্ত প্রায় ২০০টা ই-কমার্স সাইটের পেমেন্ট গেইটওয়ে লাগিয়ে দিয়েছি ও তার সিকিউরিটি সেটাপ করে দিয়েছি। আমার একটা ক্লাইন্ট আছে, কলিন নাম। তার সাইটে ডেইলি ১০০-এর উপর ফ্রড ট্রানজেকশন হয়। পরে সে আমাকে নিয়োগ দিয়েছিল এইগুলোর নাটের গুরুদের তথ্য বের করতে। এই জন্য বিভিন্ন ফোরামে ঘুরাঘুরি করছি, তাদের সাথে মিশেছি তাদের নিয়ে স্টাডি করেছি। তাদের সাথে কথা বলেছি ইভেন মাঝে মধ্যে তাদের লোক এর মতো করে তাদের সাথে চলেছি। এর পর পুরো প্রসেস জেনেছি বুঝেছি। এর পর আমার ক্লাইন্টের সিকিউরিটি দিয়েছি ও দিচ্ছি। তবে তারা প্রচুর ধুর্ত ও চালাক। তাদের ফিজিক্যালি পাওয়া বেশ কঠিন।

সূত্রঃ টেকটেকনিক

Post a Comment