Bangla Travel News: ছেঁড়াদ্বীপ থেকে সেন্টমার্টিন- এক অবাধ্য লংমার্চ


রাশেদ হাসান
ট্রলারেই ফেরার কথা ছিল। সেভাবেই আপ-ডাউন ভাড়া করা হয় আবদাল মিয়ার ট্রলার। মাঝপথে মাথা বিগড়ে দিল রইস্যা মাস্টার ওরফে আব্দুর রশিদ মাঝি। ৬ জনের এই অভিযাত্রী দলের গাইড কাম ট্রলার চালক। রইস্যা মাস্টারের মতে, একশ বার সেন্টমার্টিন দেখা আর একবার ছেঁড়াদ্বীপ টু সেন্টমার্টিন যাত্রা সমান কথা। এই কথায় কী বলা চাই বুঝে উঠতে পারলামনা কেউই। সুবোধ বালকের মতোই তাকালাম সবাই মাস্টারের দিকে, কেসটা হল ফিরতে হবে ট্রলার অথবা বোটে না।” তাহলে  এবারে একসঙ্গে প্রশ্ন। হাইটা ফিরবেন? মাস্টারের কথায় এবার রহস্য। বলতে চায় কী ব্যাটা! যা বাবা আমরা কী আউলিয়া হয়ে গেলাম না-কি রূপকথার ডালিমকুমার? যে সে সাগর নয়, আস্ত বে-অব বেঙ্গল পাড়ি দেবে পায়ে হেঁটে! পুরোপুরি বোকা বানানো গেছে শিওর হওয়ার পর রহস্যেও গিট্টু খুলল ওইস্যা ভাটার টাইমে বালির চর ওঠে। সেই পথে সোজা নাকবরাবর হাঁটা দিলে সেন্টামার্টিন গিয়া উঠা যায়। ঘোরার মজাটাই নিমেষে নষ্ট করে দিল ব্যাটা। ছেঁড়া দ্বীপ পৌঁছুতে তখনও মিনিট পনের বাকি। কিন্তু কখন সেন্টমার্টিন ফিরব- সেই কথাই মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে শুরু করে দিয়েছে ততক্ষণে। সাগরের বুকে হেঁটে সেন্ট মার্টিন! বলে কিরে!

যত তাড়া দেই অপেক্ষা করতেই হবে। কেননা ভাটা আসবে শেষ বিকালে। জোয়ার থাকতে থাকতে দুপুরের কড়া রোদ্দুর মাথায় নিয়ে রইস্যার হেলপার তমিজ ট্রলার চালিয়ে একাই ফিরল। আমরা আয়েষ করে নোনতা ডাব খেয়ে রেডি। চারটা বাজতেই শুরু হল ছেঁড়াদ্বীপ টু সেন্টামার্টিন পদযাত্রা। কিছু কিছু সুন্দর থাকে যার বর্ণনা করা যায় না। যে সৌন্দর্য দেখলে অবাধ্য হয়ে উঠতে চায় মন। এ পথ যেন সেই অবাধ্যতারই নিশ্চুপ হাতছানি। সম্ভবত কবি-টবি হওয়া দরকার। শুরুর পথটার পুরোটাই প্রবালের স্তুপ উত্তাল সমুদ্রের দখলে। আমার জানা নেই এমন আর কোন পথ আছে যার দুধারেই সমুদ্র। আঁকা-বাকা পথ গিয়ে থমকায় মধ্যের চরে। রইস্যা মাস্টারের ভাষ্যমতে এই স্থানটি সেন্টমার্টিন ও ছেঁড়াদ্বীপের সংযোগ বিন্দু। তাই এর নাম মধ্যের চর। গোটাকয়েক কেওড়া ঝাড় আর কালো প্রবালের মাঝে বকসাদা বালিয়ারি। সূর্য পিঠে ফেলে আমরা মুগ্ধ হয়ে কেবল হাঁটছি। সঙ্গে উড়ছে একদল গাঙচিল। ওরা অবশ্য আমাদের মতোন সেন্টমার্টিন যাচ্ছে না। ভাটার টানে গড়িয়ে যাওয়া জলের ফাকে বালুতে আটকা পড়া মাছ-কাকড়া শিকারই এদের উদ্দেশ্য। মধ্যদ্বীপ ছেড়ে কয়েকগজ এগুতেই আমাদেও অবাক করে দিল এক সরু খাল। নাম- মধ্যের চরের খাল। আমরা যখন এই খাল পেরুলাম তখন হাটু জল। তবে ভাটার শুরুতে কোমর পর্যন্ত থাকে এর গভীরতা। পরের পথ টুকু পুরোটাই খানিকটা চেনা-জানা। একধারে সারি বাধা কেওড়া বন অন্যধারে নীল সমুদ্রে সফেন ঢেউ। তবে ভাটার টানে সমুদ্র একটু নিশ্চুপ। নেই ফেনার সাম্বানাচ। তাতে অসংখ্য জেলে নৌকোর ছুটোছুটি দেখে মনে হল একদঙ্গল ডানপিটে কাদাজলে ফুটবল খেলছে। রইস্যা মাস্টার জানালেন এসব মাছের নৌকা। শেষ জাল টেনে সন্ধ্যার বাজার ধরতে সবাই টেশনাফ ছুটছে। পথ যত কমছে ততই বাড়ছে স্থাণীয় বসতির আনাগোনা। বাড়ছে পথেও পাশে শুটকির মাচা। চরের শিশুদেও ঝিনুক কুরানো। স্কুলে যাবার বয়সী শিশুরা সবাই কাজে ব্যস্ত। ব্যস্ত সেন্টমার্টিনও চোখে ধরা দিল কয়েক মিনিটের মধ্যে। এতো অল্প পথ অথচ ট্রলারে লাগে-প্রশ্ন করলেন সহযাত্রী নিলি আপা। এবার অবাক হওয়ার পালা রইস্যা মাস্টারের কনকি, পুরা গেছে। খবর আছে। আসলেই খবর নেই। ভাটার সময় শেষ করে সমুদ্রে তখন আবার উর্মিদের নাচানাচি। পথের ধারালো বালু আর প্রবালের কোনাকানচির ছোয়ার হিসাব দিচ্ছে পায়ের অসংখ্য কাটা-ছেড়া। কিন্তু মন বললে ভাটারে আরেকবার আয়না। একটু ছেঁড়াদ্বীপ যাই।

কীভাবে যাবেন: ঢাকা থেকে সরাসরি বাসে টেকনাফ পৌঁছে জাহাজ বা ট্রলারে সেন্টামার্টিন। সেন্টমার্টিন থেকে স্থানীয় মাছি বা গাইড নিয়ে ভাটার সময়টা নিশ্চিত জেনে চলে যান ছেঁড়াদ্বীপ। অথবা ট্রলারে ছেঁড়াদ্বীপ পৌঁছে ফেরতে পারেন পায়ে হেঁটে। সকালে রোদমুখে নিয়ে যেতে হবে বলে দেখার সুযোগ কম। পায়ে হাঁটার জন্য বিকালটাই বেশি ভালো তাই। রোমাঞ্চের মাত্রাছাড়া টানে কোনও রিস্ক না  নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। যেকোনও ট্রাভেল ট্যুরসয়ের সঙ্গেও যাওয়া যায়। তবে অবশ্যই ঝড়-বৃষ্টির সময়টা বাদ রেখে।

-touristguide24

Post a Comment