ইসলামে সুফিজম বা আধ্যাত্মবাদ


ইসলাম ধর্মের অন্যতম মূল তত্ত্ব হচ্ছে আত্মশুদ্ধি, যার অপর নাম তাসাউফ বা সুফিতত্ত্ব। আর সুুফিতত্ত্বের মূল উৎস হচ্ছে আল কোরআন। আল কোরআনের সূরা আল ইমরানে আল্লাহ পাক বলেন ‘হে রাসূল! আপনি বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস, তবে আমাকে অনুসরণ করো, তিনি তোমাদেরকে ভালোবাসেন।’উল্লেখ্য যে, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও মহব্বতই সুফিবাদের মূলকথা।

মানুষকে সৃষ্টি করার পর থেকেই মানুষের প্রতি স্রষ্টার এক গভীর সম্পর্কের সৃষ্টি হয়। এই সম্পর্কের অপর নাম প্রেম, মহব্বত, ভালোবাসা। ভালোবাসা কখনও একপক্ষীয় হতে পারে না। দু’পক্ষ থেকেই তা হতে হবে। তার মানে আল্লাহ ভালোবাসার টানেই মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। মানুষের কাছে আল্লাহ পাকও চান শুধু প্রেম, ভালোবাসা, মহব্বত। মানুষ যেন মহব্বতের আকর্ষণে আল্লহর কাছে সমর্পিত হয়, তার জন্য সবকিছু উজাড় করে দেয়। তাতেই আল্লাহ খুশি হন। কিন্তু মানুষ আল্লাহর অস্তিত্বে নিজেকে আর কতটুকুইবা উজাড় করতে পারে? সে সামর্থ্যইবা তার কতটুকু? কিন্তু সব সামর্থ্য দিয়ে যেটুকু মহব্বত সে নিবেদন করতে সক্ষম, আল্লাহ তাতেই খুশি। বাকিটুকু আল্লাহর কাজ। তিনি বান্দাকে গ্রহণ করে নেন তাঁর অপার করুণা দিয়ে।

সুফিদের মতে, আমাদের দৃশ্যমান জগৎ অবাস্তব, একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই বাস্তব। তাই তো তুর পাহাড়ে যখন হজরত মুছা (আ.) মহান প্রভুর সাক্ষাতে তুর পাহাড়ে গমন করেন, তখন আল্লাহর নূরের তাজাল্লিতে পাহাড় জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যায়, হজরত মুসা (আ.) অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে যান। এখানে সুফিদের ব্যাখ্যা, একমাত্র আল্লাহই বাস্তব। আর সবই অবাস্তব। তাই বাস্তব আল্লাহর উপস্থিতিতে অবাস্তব তুর পাহাড় ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার, সে অগ্নিতেজে পাহাড় পুড়ে ছাই হয়ে গেলেও অক্ষত থেকে গেলেন হজরত মুসা (আ.)। এর কারণ আল্লাহর প্রেম, মহব্বত। আল্লাহর প্রতি হজরত মুসা (আ.) এর যে প্রেম, সেটাই তাঁর অস্তিত্বের অবস্থিতির কারণ।

ইমাম আল গাজ্জালি শুধু ধর্মতত্ত্ব নিয়ে যারা মেতে থাকেন, তাদের ‘আসহাব আকওয়াল’ অর্থাৎ বচনপটু বলে আখ্যায়িত করেছেন। আর সুফিদের বলেছেন, ‘আরবাবে আহওয়াল’ অর্থাৎ উপলব্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি। তার মানে, যে মতবাদ ধর্মের গতানুগতিকতাকে প্রশ্রয় না দিয়ে হৃদয়ের উপলব্ধি দিয়ে বিচার করে, সেটাই সুফিবাদ। একই কথা বলেছেন হজরত জুনাইদ বোগদাদি (র.)। সুফিবাদ বা তাসাউফকে তিনি অভিহিত করেছেন ‘নিজের অজ্ঞতার উপলব্ধি’ বলে।

কিসের এই অজ্ঞতা? তা হচ্ছে বিশালত্ব, তথা আল্লাহকে জানার ও তাঁকে চেনার ব্যাপারে অজ্ঞতা। কীভাবে তাঁকে চেনা যাবে? ভক্তি দিয়ে, প্রেম দিয়ে। এই প্রেমের অন্য নামই তো সুফিবাদ। আর এই প্রেমের সাধকরাই সুফি সাধক। মাওলানা রুমীর দৃষ্টিতে ‘হারকে রা জামা যে ইশকি চাক শুদ,/উ যে হেরচ ও আইবে কুল্লি পাক শুদ।’ অর্থাৎ ‘যার জামা (অস্তিত্ব) প্রেম দ্বারা ছিন্নভিন্ন হয়, তিনি সব ধরনের দোষখাতা থেকে বিমুক্ত হয়ে যান।’

তিনি আরো বলেন, ‘ইশক আওয়াল, ইশক আখের, ইশক কুল,/ইশক শাক, ইশক নাখল, ইশক গুল।’ ‘প্রেম আদি, প্রেম অন্ত, প্রেমই হয় মূল,/প্রেম ডাল, প্রেম বৃক্ষ, প্রেমই হয় ফুল।’ অর্থাৎ স্রষ্টার সৃষ্টির সর্বত্রই প্রেম। সৃষ্টির আদিতে প্রেম, সৃষ্টির অস্তিত্বেও প্রেম। রাসূলে পাক (সা.) এর মেরাজ গমন, আল্লাহ পাকের দিদার লাভ, তার মূলেও তো প্রেম। উভয়মুখী প্রেম। মাওলানা রুমী আরও বলেন, ‘জিসমে খাক আজ ইশক বার আফলাক শুদ’- অর্থ ‘প্রেমের বলেই মাটির দেহ আকাশে উন্নীত হয়েছিল।’

তাসাউফের শিক্ষা হলো, জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে, প্রতি মুহূর্তে আল্লাহর অস্তিত্বে নিজকে বিলীন করে রাখতে হবে। আর মহব্বতই তার একমাত্র পথ। জগতের সবকিছুর মোহ-কামনাকে বিসর্জন দিয়ে তাঁর প্রতি মহব্বত বুকে ধারণ করে রত থাকতে হবে তাঁরই এবাদতে। এটাই তো সুফিতত্ত্বের মূল কথা। এ মহান তত্ত্বের অনুসারী ও সাধক যারা, তারাই তো সুফি সাধক। তাপসী রাবেয়া বসরী তার মুনাজাতে আল্লাহকে স্মরণ করে বলতেন- ‘হে মাবুদ! আমি যদি বেহেশতের লোভে তোমার এবাদত করি, তা হলে বেহেশত আমার জন্য চিরতরে হারাম করে দিও। দোজখের ভয়ে যদি আমি তোমার এবাদত করি, তা হলে আমাকে চিরকাল দোজখের আগুনে দগ্ধ করবে। আর যদি শুধু তোমাকে পাওয়ার জন্য আমি তোমার এবাদত করি, তবে তোমার থেকে আমাকে তুমি বঞ্চিত করবে না।’ এটাকেই তো বলে আল্লাহর প্রতি প্রেম, আল্লাহর প্রতি মহব্বত। মহব্বতের মাধ্যমে নিজের অস্তিত্বকে বিলীন করে দিয়ে আল্লাহর অস্তিত্বে লীন হয়ে যাওয়া। যাকে মনছুর হাল্লাজ (র.) পরিণত করেছিলেন ‘ফানা ফিল্লা’তে। হজরত জুনায়েদ বোগদাদি (র.) বলেছেন, ‘আপন অসহায়ত্বের উপলব্ধি’, হজরত মারুফ আল খারকি (র.) বলেছেন, ‘ঐশী সত্তার উপলব্ধি’, ফরিদুদ্দীন আত্তার (র.) বলেছেন, ‘বিন্দুকে সিন্ধুতে পরিণত করা’।

লিখেছেন : আ শ ম বাবর আলী
গ্রন্থনা ও সম্পাদনা : মাওলানা মিরাজ রহমান
সৌজন্যে : দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ

-priyo

Post a Comment