ধর্মঘটে সারাদেশের নৌ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন



মজুরি বৃদ্ধিসহ চার দফা দাবিতে দ্বিতীয় দিনের মতো বুধবারও নৌযান শ্রমিকদের ধর্মঘট অব্যাহত ছিল। ফলে বন্ধ রয়েছে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরে পণ্য ওঠানামা। মালিকদের চাপের মুখে ঢাকা-বরিশাল রুটে কয়েকটি লঞ্চ চলাচল করলেও অভ্যন্তরীণ রুটে সব লঞ্চ বন্ধ ছিল। এতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নৌ যোগাযোগ অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে ভোগান্তিতে পড়েছেন নৌপথের হাজার হাজার যাত্রী।

নৌযান শ্রমিক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক বুলবুল মাস্টার অভিযোগ করেন, কিছু মালিক তাদের শ্রমিকদের দিয়ে লঞ্চ চালানোর জন্য নানা হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন। এতে শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।

এ ধরনের হুমকি-ধামকি থেকে লঞ্চ মালিকদের বিরত থাকার অনুরোধ জানান তিনি।

তবে বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের মহাসচিব চৌধুরী আশিকুল আলম সমকালকে বলেন, 'যেসব শ্রমিক মজুরি নিয়ে সন্তুষ্ট, তারাই লঞ্চ চালাচ্ছে। কিন্তু সব শ্রমিকের মজুরি নিশ্চিত করার দায়িত্ব এখন সরকারের।'

নৌযান মালিকদের সংগঠনের নেতা ও এফবি ফারহান লঞ্চের স্বত্বাধিকারী গোলাম কিবরিয়া টিপু দাবি করেন, যাত্রীবাহী সব ধরনের নৌযান চলাচল করছে। শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে কোনো সমস্যা নেই।

চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, ধর্মঘটের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে সব ধরনের পণ্য খালাস বন্ধ রয়েছে। বন্দরের ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের প্রধান নির্বাহী মাহবুব রশিদ বলেন, বুধবার কোনো জাহাজ বুকিং না হওয়ায় বহির্নোঙরে পণ্য খালাস বন্ধ রয়েছে। ফলে এখনও অপেক্ষমাণ রয়েছে ৩২টি মাদার ভেসেল।

এদিকে, বন্দরের বহির্নোঙরে চলমান লাইটার ধর্মঘট প্রত্যাহারে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নৌমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম। গত মঙ্গলবার রাতে নৌমন্ত্রী শাজাহান খানকে এক পত্রের মাধ্যমে এ আহ্বান জানান তিনি।

খুলনা ব্যুরো জানায়, কর্মবিরতির কারণে খুলনার ভৈরব ও রূপসা নদীতে বন্ধ ছিল লঞ্চ, কার্গো ও লাইটারেজ জাহাজ চলাচল। নগরীর ৪, ৬ ও ৭ নম্বর ঘাটে কার্গো ও লাইটারেজ জাহাজগুলো নদীতে নোঙর করে থাকলেও সেগুলোতে মালপত্র বোঝাই ও খালাস হচ্ছে না। শ্রমিকরা অলস সময় কাটাচ্ছেন। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন বন্দর ব্যবহারকারী ও যাত্রীরা।

বরিশাল ব্যুরো জানায়,বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলে অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রীবাহী এবং পণ্যবাহী নৌযান চলাচল বন্ধ ছিল। তবে ঢাকা-বরিশাল রুটে যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল করছে। সকালে বরিশাল নৌবন্দরে গিয়ে দেখা গেছে, অভ্যন্তরীণ রুটে ছোট-বড় সব ধরনের লঞ্চ চলাচল বন্ধ রয়েছে। মালবাহী কার্গো ও জ্বালানিবাহী অয়েল ট্যাঙ্কারও চলছে না। তবে ঢাকা থেকে মঙ্গলবার রাতে ছেড়ে আসা বিলাসবহুল নৌযান এমভি পারাবত-১২, এমভি টিপু-৭ ও এমভি সুরভী-৭ যাত্রী নিয়ে বুধবার ভোরে বরিশাল নদীবন্দরে পৌঁছেছে। ধর্মঘটী শ্রমিকরা বেলা ১১টায় বন্দর এলাকায় বিক্ষোভ করে।

মংলা প্রতিনিধি জানান, বন্দর চ্যানেলে অবস্থানরত দেশি-বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজের পণ্য বোঝাই-খালাস ও পরিবহন কাজ বন্ধ রয়েছে। বন্দর জেটি ও চ্যানেলে পণ্য খালাসের অপেক্ষায় এসব জাহাজ অলস পড়ে থাকায় মোটা অঙ্কের লোকসান গুনতে হচ্ছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।

সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক ওয়েজুল ইসলাম বুলবুল বলেন, 'নৌমন্ত্রী শাজাহান খান মঙ্গলবার মালিক পক্ষকে দাবি মেনে নিয়ে সমস্যা সমাধানের কথা বললেও মালিক পক্ষ এখনও তাতে সাড়া দেয়নি।'

নলছিটি (ঝালকাঠি) প্রতিনিধি জানান, পণ্যবাহী নৌযান বন্ধ থাকায় দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে প্রাচীন বন্দর ঝালকাঠির ব্যবসায়ীরা দুর্ভোগে পড়েছেন। অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকায় দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে নৌপথে যাতায়াত বন্ধ রয়েছে ঝালকাঠিবাসীর।

ভোলা প্রতিনিধি জানান, নৌযান শ্রমিকদের ডাকা অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে অচল হয়ে পড়েছে দ্বীপজেলা ভোলার যোগাযোগ ব্যবস্থা। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজার হাজার যাত্রী। মঙ্গলবার রাতে ভোলা সদর থেকে কর্ণফুলি নামের একটি লঞ্চ কিছু যাত্রী নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে গেলেও গত দু’দিনে আর কোনো লঞ্চ ঘাট ছাড়েনি। এতে রাজধানী ঢাকা ও বরিশালগামী যাত্রীরা চরম বিপাকে পড়েছেন। ফলে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া উপেক্ষা করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জেলে ট্রলার স্পিডবোটে  অনেক যাত্রীকে উত্তাল মেঘনা ও তেঁতলিয়া নদী পারাপার হতে দেখা গেছে।

চাঁদপুর প্রতিনিধি জানান, চাঁদপুর লঞ্চঘাট থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে গেছে যাত্রীবাহী চারটি লঞ্চ। তবে ধর্মঘটের কারণে যাত্রীর সংখ্যা ছিল কম। নৌযান শ্রমিক লীগ নেতা বিপ্লব সরকার বলেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ধর্মঘট চলবে। তবে যেসব লঞ্চ ছেড়ে যাচ্ছে, সেগুলোর শ্রমিকরা হয়তো তাদের দাবি পূরণের আশ্বাস পেয়েছেন।

-samakal

Post a Comment