দেশে চালু হচ্ছে ডিজিটাল ওয়ালেট



স্মার্টফোন অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে কেনাকাটায় ডিজিটাল ওয়ালেট 'অ্যাপল পে' দারুণ জনপ্রিয়। অ্যাপলের পর স্যামসাংও চালু করেছে স্যামসাং পে নামক অ্যাপ। কেনাকাটায় প্লাস্টিক কার্ডের বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এ সেবা। সম্প্রতি দেশেও চালু হয়েছে 'পে ৩৬৫' নামে ডিজিটাল ওয়ালেট। লিখেছেন ইমদাদুল হক

প্রযুক্তির অগ্রসরতায় ডিভাইসের আকার ছোট হয়ে হয়ে এসেছে। নগদ টাকা বহনের বদলে প্লাস্টিক কার্ড বেশ জনপ্রিয়। বুথ কিংবা পস মেশিন সেবার সীমাবদ্ধতা থাকায় এরই ফাঁকে প্রান্তিক পর্যায়ে পেঁৗছে যায় মোবাইল ব্যাংকিং। তবে এরই মধ্যে সম্পূর্ণ নিরাপদ একটি ডিজিটাল ওয়ালেট যৌথভাবে এনেছে ডাটাসফট সিস্টেমস বাংলাদেশ ও ফিনটেক লিমিটেড। হাতের মোবাইল ফোনকে ওয়ালেটে রূপ দিতে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো চালু হচ্ছে 'পে-৩৬৫' অ্যাপ। আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে গুগল প্লেস্টোরে অ্যাপটি অবমুক্ত করা হবে। প্রথম দিকে রাজধানীতে সীমিত পরিসরে এই সেবা চালু হচ্ছে। 


মোবাইল ওয়ালেট কী


মোবাইল ওয়ালেট হচ্ছে ব্যাংকিংয়ের স্মার্টফোন সংস্করণ। ব্যবহারবান্ধব হওয়ায় মোবাইল ব্যাংকিংয়ে গ্রাহক সংখ্যা ও আর্থিক লেনদেন বৃদ্ধির পাশাপাশি গ্রাহকের নিজস্ব ওয়ালেট (অ্যাকাউন্ট) থেকে অর্থ আদান-প্রদানের প্রবণতা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই সেবা হয়ে উঠছে আরও পরিণত ও শক্তিশালী। তাই বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিং কেবল টাকা আদান-প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং অনেক নতুন নতুন সেবা যুক্ত হয়েছে এতে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মোবাইল ফোনের এয়ারটাইম ক্রয়ের পাশাপাশি দোকানে কেনাকাটাসহ নানা ধরনের কাজ করা যায়। এ ছাড়া ওয়ালেটে ব্যাংকিংয়ের সব সুবিধা যেমন_ জমা টাকার ওপর ইন্টারেস্টও পাওয়া যায়। দেশের প্রথম ডিজিটাল ওয়ালে 'পে-৩৬৫' রূপকার ফিনটেক লিমিটেড ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাইমিন মোস্তফা মনে করছেন, এ সেবা দেশের মোবাইল অর্থনীতি এক ধরনের ইকোসিস্টেম তৈরি করতে সক্ষম হবে। এই মোবাইল ওয়ালেট ব্যবহারের মাধ্যমে আগামী দিনগুলোতে ই-কমার্সসহ নানা ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার বৃদ্ধি পাবে। অনলাইন লেনদেনের ক্ষেত্রটি হবে পুরোপুরি নিরাপদ। গ্রাহক স্বস্তিতে কেনাকাটা করতে পারবেন।


দেশে প্রথম ডিজিটাল ওয়ালেট 


এতদিন পর্যন্ত অনলাইনে কেনাকাটায় বিকাশ ও প্লাস্টিক কার্ডই ছিল মূল্য পরিশোধের অন্যতম মাধ্যম। পে-৩৬৫ এখান থেকে আরও এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে আমাদের। এখন একটি মোবাইল ফোনই হয়ে উঠেছে ওয়ালেট। এই স্বপ্নের শুরুটা হয় ২০১৩ সালে। যুক্তরাষ্ট্রের ওহিও স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ফাইন্যান্সে স্নাতক করার সময় এই পরিকল্পনাটি শুরু করেন মোহাইমিন মোস্তফা। অভিজ্ঞতা ও নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে ওই সময় তার পাশে এসে দাঁড়ান বন্ধু তানজিম শামস। কলোম্বাসে প্রতিষ্ঠা করেন ফাইন টেক। ব্যবসায় পরিকল্পনা ও সফটওয়্যার নকশা তৈরি করে ফিরে আসেন দেশে। এখানে এসে পেমেন্ট গেটওয়ে না থাকায় তরুণ উদ্যোক্তা হিসেবে প্রথমেই হোঁচট খেতে হয় তাকে। এরপর বন্ধুর বাবার প্রতিষ্ঠান ডেটাসফট প্রতিষ্ঠাতা মাহবুব জামানকে জানান স্বপ্নের কথা। সন্তানের স্নেহে তিনি হাত বাড়িয়ে দেন। ইতিমধ্যে দেশে ন্যাশনাল পেমেন্ট গেটওয়ে অবমুক্ত হয়। এর পর পরই ডাচ্ বাংলা ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি করে সাধারণের দোরগোড়ায় ডিজিটাল ওয়ালেট 'পে-৩৬৫' নিয়ে আসেন তরুণ এ উদ্যোক্তা। বর্তমানে ১২ সদস্যের পে-৩৬৫ দলে রয়েছেন ৮ জন ডেভেলপার। তারা প্রতিদিনই নিজেদের ডেভেলপ করা অ্যাপটির মানোন্নয়নে কাজ করছেন। নিজেরাই নিজেদের অ্যাপ্লিকেশনটি হ্যাক করার চেষ্টা করছেন। 


পে-৩৬৫ কী 


পে-৩৬৫ মূলত একটি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন। কিউআর কোড ও এনএফসি প্রযুক্তি সমর্থিত এই অ্যাপটি ইতিমধ্যেই ডেভেলপ করা হয়েছে অ্যান্ড্রয়েড সংস্করণের জন্য। সব ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে আইওএস এবং উইন্ডোজ ফোনেও মিলবে এই অনলাইন পেমেন্টে সেবা। অ্যাপটি মোবাইল ফোনে ইনস্টল করলেই এটি পরিণত হবে ব্যাংক হিসাবে (অ্যাকাউন্ট)। তবে এই অ্যাকাউন্ট থেকে কোনো কিছু কিনে প্লাস্টিক কার্ড কিংবা চেকে মূল্য পরিশোধ করার আর প্রয়োজন হবে না। পে স্ক্যানারে মোবাইল ফোনের পর্দা প্রদর্শন করেই মূল্য পরিশোধ করা যাবে। এক্ষেত্রে হিসাব গ্রহিতার তথ্য গোপন রাখতে পেমেন্টের ক্ষেত্রে ভেসে উঠবে বার কোড। এই বারকোড রিড করেই চলবে ব্যাংকিং লেনদেন। 


যেভাবে ব্যবহার করবেন 


গুগল প্লেস্টোর থেকে যে কোনো স্মার্টফোনে অ্যাপটি ইনস্টল করার পর একটি কার্ড নম্বর দিয়ে একবার সাইনআপ করলেই পরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হবে পে-৩৬৫। প্রাথমিকভাবে মীনা বাজার, আগোরা, ক্রীমসন কাপ, টাবাক, কোবে, টোকিও এক্সপ্রেস, হাংরি নাকি, বাগডুম থেকে কেনাকাটা করতে পারবেন গ্রাহক। আগামী ৭ সেপ্টেম্বর থেকে এটি ধানমণ্ডি, গুলশান, বনানী, বারিধারায় সীমিত থাকছে। সেবার পরিধি বাড়াতে অন্যান্য ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি করছে। ফলে পে-৩৬৫ চিহ্নিত যে কোনো দোকান থেকে কেনাকাটা করলে স্মার্টফোন থেকে প্রথমে অ্যাপটি সাইন ইন করে পে অপশনে স্পর্শ করতেই একটি কিউআর কোড আসবে। বিক্রেতার কাছে থাকা পস মেশিনে স্মার্টফোনের পর্দায় ভেসে ওঠা এই কোডটি রিড করেই সম্পন্ন হবে মূল্য পরিশোধের কাজ। 


কেনাকাটায় নিরাপত্তা 


মোবাইল ওয়ালেটে টাকা রাখার একটা বড় সুবিধা হচ্ছে টাকার নিরাপত্তা বাড়ে। যেমন_ টাকা হাতে থাকলে খরচ হয় বেশি। সেটা সামলানো মুশকিল। আবার ছিনতাইকারী থেকে শুরু করে হারানোর ভয় থাকে। পাশাপাশি রয়েছে হালের এসএমএ স্পুফিং বা সিম ক্লোনিংয়েরও ঝুঁকি। কিন্তু মোবাইল ওয়ালেটে টাকা থাকলে টাকা নিরাপদ থাকে। কারণ, এ ক্ষেত্রে ব্যাংক টু ব্যাংক লেনদেন হয়। নগদ টাকার কোনো কারবার থাকে না। নিরাপত্তার জন্য পে-৩৬৫ ব্যবহারে প্রতিবার লেনদেনের সময় গোপন পিন নম্বর ব্যবহার করতে হবে। যার ফলে ফোন হারিয়ে গেলেও অন্য কেউ পিন নম্বর ছাড়া কোনো তথ্য দেখতে অথবা লেনদেন করতে পারবে না। ফলে ব্যবহৃত সেলফোনটি হারিয়ে গেলেও সঞ্চিত টাকা বেহাত হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই নেই।


-সমকাল

Post a Comment