ফাঁস করা প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা


ফাঁস করা প্রশ্নপত্রে অবাধে বিএসসি ইন নার্সিং ও বিএসসি ইন পাবলিক হেলথ নার্সিংয়ে চূড়ান্ত পরীক্ষা দিচ্ছেন দেশের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে কর্মরত ৬২ জন নার্স। এর মধ্যে ৯৫ শতাংশ নার্স সরকারি হাসপাতালের দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা। ইতিমধ্যে উভয় কোর্সের পাঁচটি করে পরীক্ষা শেষ হয়েছে। আজ শনিবার সকালে ‘প্রিন্সিপালস অ্যান্ড মেথডস অব টিচিং’ বিষয়ে ৫০ নম্বরের পরীক্ষা হবে।

চট্টগ্রামের সরকারি ফৌজদারহাট নার্সিং কলেজে এ পরীক্ষা চলছে। কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু লিখিত পরীক্ষা নয়, এমসিকিউ (নৈর্ব্যক্তিক) পরীক্ষার উত্তরও ফাঁস হয়েছে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের একজন সিনিয়র স্টাফ নার্স, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের একজন প্রভাবশালী স্টাফ নার্সসহ ২১ জনের একটি গ্রুপ (সবাই পরীক্ষার্থী) ওই প্রশ্নগুলো ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা করে কিনেছেন। পরে তাঁরা সেগুলো মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে দ্বিতীয় বর্ষের অন্য পরীক্ষার্থীদের কাছে বিক্রি করেছেন। তবে নার্সিং কলেজের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দাবি করছেন, তাঁরা প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়ে কিছু জানেন না।

দ্বিতীয় বর্ষে উভয় কোর্সে ১০টি করে পরীক্ষা হবে। সব পরীক্ষার ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র কালের কণ্ঠের হাতে এসেছে। লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের পাশাপাশি কয়েকটি পরীক্ষার নৈর্ব্যক্তিক অংশের উত্তরপত্রও পাওয়া গেছে। ইতিমধ্যে পাঁচটি শেষ হয়েছে। এসব পরীক্ষার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, পরীক্ষার হলে যে প্রশ্নপত্র সরবরাহ করা হয়েছে, তার সঙ্গে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রের হুবহু মিল রয়েছে। 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলেও সর্বশেষ গত ২ আগস্ট পর্যন্ত অনুষ্ঠিত পরীক্ষাগুলোয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো পর্যবেক্ষক ও পরিদর্শক টিম যায়নি। কলেজের শিক্ষক-শিক্ষিকারাই ওই পরীক্ষাগুলো নিয়েছেন।

অভিযোগ উঠেছে, একেকজন পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা নিয়ে প্রশ্ন বিক্রি করা হয়েছে। সে হিসাবে ছয় থেকে সাত লাখ টাকা বিএসসি ইন নার্সিং ও বিএসসি ইন পাবলিক হেলথ নার্সিং (দ্বিতীয় বর্ষ) পরীক্ষার্থীদের (কর্মরত নার্স) কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে সংঘবদ্ধ একটি চক্র।

একই কলেজের প্রথম বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষায়ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ উঠেছে। এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী ৬৩ শিক্ষার্থীর কাছ থেকেও গড়ে পাঁচ থেকে ১০ হাজার টাকা করে আদায় করা হয়েছে।

প্রশ্নপত্র ফাঁস প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ফৌজদারহাট নার্সিং কলেজের অধ্যক্ষ সালমা সুলতানা গতকাল বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রশ্নপত্র ফাঁসের কোনো অভিযোগ এখনো আসেনি। আপনি (প্রতিবেদক) অফিসে আসেন। এ ব্যাপারে কথা বলব।’ পরীক্ষায় পরিদর্শক, পর্যবেক্ষক কেউ আসছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘২০ জুলাই থেকে দ্বিতীয় বর্ষের এবং ৩০ জুলাই থেকে প্রথম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হয়েছে। ২৩ আগস্ট পরীক্ষা শেষ হবে। তবে এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, কন্ট্রোলার কেউ আসেননি। ওনারা হঠাৎ পরিদর্শন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্যবেক্ষকরাও আসেননি।’

পরীক্ষা কারা নিচ্ছেন—এ প্রশ্নের জবাবে সালমা সুলতানা বলেন,  ‘ভিজিলেন্স টিম করা হয়েছে। এ টিমে কলেজের শিক্ষক-শিক্ষিকারাই আছেন।’

এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. সেলিম মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, ‘প্রশ্নপত্র কিভাবে ফাঁস হবে তা আমার বোধগম্য হচ্ছে না। কলেজের সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শিক্ষকরা প্রাথমিক প্রশ্ন তৈরি করে বিশ্ববিদ্যালয়ে দেন। এরপর প্রশ্নপত্র তৈরির জন্য মডারেটর রয়েছেন। এ সম্পর্কিত কমিটির সদস্যদের উপস্থিতিতে প্রশ্নপত্র তৈরির পর তা সিলগালা করে পরীক্ষার আগে কলেজের কাছে হস্তান্তর করা হয়। আমার দৃঢ় বিশ্বাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রশ্ন ফাঁস হয়নি। তবে কোত্থেকে প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে তা প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারছি না।’

চিকিৎসা অনুষদের ডেপুটি রেজিস্ট্রার এ কে এম মাহফুজুল হক খোকন বলেন, ‘প্রতিটি পরীক্ষার জন্য এক সেট প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করে ফৌজদারহাট নার্সিং কলেজের অধ্যক্ষকে দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষা গত ২০ জুলাই শুরু হওয়ার আগে প্রশ্নপত্র হস্তান্তর করা হয়েছে। প্রথম বর্ষের পরীক্ষা শুরু হয়েছে গত ৩০ জুলাই। এ পরীক্ষার কয়েকটি বিষয়ে প্রশ্ন সরবরাহ বাকি ছিল, সেগুলো গত বৃহস্পতিবার দেওয়া হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে এ বিষয়টি প্রথম শুনলাম আপনার কাছ থেকে।’

জানা গেছে, গত ২০ জুলাই বিএসসি ইন নার্সিং এবং বিএসসি ইন পাবলিক হেলথ নার্সিং পরীক্ষা শুরু হয়েছে। এর মধ্যে বিএসসি ইন নার্সিংয়ে ২০ জুলাই ‘কম্প্রিহেনসিভ নার্সিং অ্যান্ড প্যাথফিজিওলজি’, ২৩ জুলাই ‘হেলথ এডুকেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন স্কিলস’, ২৬ জুলাই ‘কারিকুলাম ডেভেলপমেন্ট’, ৩০ জুলাই ‘সোসিওলজি’ ও ২ আগস্ট ‘নার্সিং ম্যানেজমেন্ট’ পরীক্ষা হয়েছে। আজ ‘প্রিন্সিপালস অ্যান্ড মেথডস অব টিচিং’ পরীক্ষা হবে, সকাল ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত পরীক্ষা চলবে। এ ছাড়া ১০ আগস্ট ‘নার্সিং অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’, ১৩ আগস্ট ‘মেন্টাল হেলথ, ফিজিওলজি অ্যান্ড ফিজিয়াট্রিক নার্সিং’, ১৬ আগস্ট ‘এপিডিমিউলজি অ্যান্ড কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোল’ এবং ২০ আগস্ট ‘রিপ্রোডাক্টিভ হেলথ অ্যান্ড ফারটিলিটি’ পরীক্ষা হবে।

বিএসসি ইন পাবলিক হেলথেরও ১০টি বিষয়ের মধ্যে পাঁচটির পরীক্ষা হয়েছে। বিএসসি ইন নার্সিংয়ের মতো আজ তাদেরও ‘প্রিন্সিপালস অ্যান্ড মেথডস অব টিচিং’ পরীক্ষা হবে। বাকি চারটি পরীক্ষাও একই বিষয়ে।   

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কলেজের সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শিক্ষকরাই প্রশ্ন তৈরি করেন। তাঁদের কেউ প্রশ্নগুলো হাতে লিখেছেন, কেউ কম্পিউটারে কম্পোজ করেছেন। পরে সেগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে পাঠানো হয়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা অনুষদ থেকে চার সদস্যের একটি কমিটি করে দেওয়া হয় প্রশ্ন মডারেট করার জন্য। দেখা গেছে, অনুষদ থেকে মডারেট করা চূড়ান্ত প্রশ্নের সঙ্গে ফাঁস হওয়া প্রশ্নগুলো হুবহু মিল রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, কলেজের শিক্ষকদের করা প্রশ্নগুলো পরীক্ষার আগে শিক্ষার্থীদের কাছে বিক্রি করা হয়েছে। কয়েক সেট প্রশ্ন করার নিয়ম থাকলেও প্রতি বিষয়ে কেবল এক সেট প্রশ্ন করা হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের এক সিনিয়র স্টাফ নার্স, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের এক প্রভাবশালী স্টাফ নার্সসহ ২১ জনের একটি গ্রুপ (সবাই পরীক্ষার্থী) প্রশ্নগুলো ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা করে কিনেছেন। পরে তাঁরা দ্বিতীয় বর্ষের অন্য পরীক্ষার্থীদের কাছে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে সেগুলো বিক্রি করেছেন। দ্বিতীয় বর্ষের প্রশ্নের ফাঁসের সঙ্গে কলেজের চারজন শিক্ষক জড়িত রয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। নিয়ম অনুযায়ী, পরীক্ষাগুলোয় এমসিকিউ প্রশ্ন হলরুমে দেওয়ার পর তা পূরণ করে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের দেন। এমসিকিউর প্রশ্ন শিক্ষার্থীদের হল থেকে বাইরে নিতে দেওয়া হয় না। কিন্তু দেখা গেছে, এমসিকিউর উত্তরগুলো শিক্ষার্থীদের আগেই দেওয়া হয়েছে।

প্রথম বর্ষের ফাঁস করা প্রশ্নপত্র চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের এক সিনিয়র স্টাফ নার্স পেয়েছেন টাকার বিনিময়ে। পরে তাঁর মাধ্যমে ওই বর্ষের অন্য শিক্ষার্থীদের কাছে বিক্রি করা হয়েছে।

-kalerkantho

Post a Comment