মানব সত্তার নিয়ন্ত্রক কলব নয় মস্তিষ্ক!


কলব মানবদেহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। কোরআনুল করিমে এ বিষয়ে ১২৬টি আয়াত বিদ্যমান রয়েছে, সেসব আয়াতে কলবের কর্মকা- সবিস্তারে আলোচিত হয়েছে। যেমন- ‘তাদের কলবগুলোতে রোগ আছে।’ (সূরা বাকারা : ১০)। ‘তাদের কলব আছে; কিন্তু তারা তা দ্বারা বোঝে না।’ (সূরা আরাফ : ১৭৯)। ‘তবে যদি তাদের কলব থাকত যা দ্বারা তারা বিবেচনা করবে।’ (সূরা হজ : ৪৬)। হাদিস শরিফে এসেছে- জেনে রাখ! মানবদেহে এমন একটি ‘মুদগা’ রয়েছে, যা সুষ্ঠু হলে সমগ্র দেই সুষ্ঠু হয়; আর তা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সমগ্র দেহই ক্ষতিগ্রস্ত হয়; জেনে রাখ! তা হলো ‘কলব’। (বোখারি)। এ বিশেষ ‘মুদগা’ যাকে ‘কলব’ বলা হয়েছে তা শরীরের কোথায় অবস্থিত? এ সম্পর্কে তিনটি ধারণা প্রচলিত আছে।

(ক) কেউ কেউ বলেন কলব হলো রুহ (আত্মা, প্রাণ বা জীবন); কিন্তু এটা সঠিক হতে পারে না। কেননা রুহের কোনো নির্ধারিত আকার নেই এবং শরীরের মধ্যে তার কোনো সুনির্দিষ্ট স্থান বা অবস্থানও নেই। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তারা আপনাকে রুহ সম্পর্কে প্রশ্ন করে, আপনি বলুন রুহ আমার রবের নির্দেশ হতে; আর তোমাদের সামান্য জ্ঞানই দেয়া হয়েছে।’ (সূরা বনি ইসরাঈল : ৮৫)।

(খ) কেউ বলেন কলব হলো নফস (রিপুগুলো); কিন্তু এটাও সঠিক হতে পারে না। কেননা নফসেরও কোনো নির্ধারিত আকার নেই এবং শরীরের মধ্যে তার কোনো সুনির্দিষ্ট স্থান বা অবস্থানও নেই। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর আমি আমার নফসকে নির্দোষ বলি না, নিশ্চয়ই নফস (রিপুগুলো) অবশ্যই মন্দ কাজের প্রতি নির্দেশ করে, আমার রব যাকে রহমত করেন তাকে ছাড়া; নিশ্চয়ই আমার রব ক্ষমাশীল ও দয়ালু।’ (আল কোরআন, সূরা ইউসুফ : ৮৫)।

(গ) কারও কারও মতে, কলব হলো হৃৎপিণ্ড। আসলে এটি একটি প্রাচীন ধারণা। এক সময় মানুষ মনে করত হৃৎপি-ই মানুষকে পরিচালিত করে, তাই হৃৎপিণ্ডকে ‘কলব’ বলা হতো। কিন্তু এখন আমরা নিশ্চিতভাবে জানি (অর্থাৎ বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত) যে, হৃৎপি- মানুষকে পরিচালিত করে না, বরং মানুষকে পরিচালনা করে তার মস্তিষ্ক, সুতরাং এটি সুনির্দিষ্ট করে বলা যায় যে, ‘কলব’ হলো মস্তিষ্ক। হৃৎপিণ্ড হলো মোটরের মতো যা শুধু শরীরে রক্ত সঞ্চালন করে থাকে আর কলব হলো কম্পিউটারের হার্ডডিস্কের মতো, যা সব কিছুকে পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করে।

আমরা দেখব একজন হাফেজ বা আলেমের হৃৎপিণ্ড যদি একজন মূর্খ লোকের হৃৎপিণ্ডের সঙ্গে অদলবদল করা হয় তবে তাদের উভয়ের মধ্যে পূর্বাপর কোনোই পার্থক্য হবে না। কোনো পণ্ডিত লোকের হৃৎপিণ্ড কেটে বাদ দিয়ে অন্যের হৃৎপিণ্ড লাগালে ওই পণ্ডিত লোকের পাণ্ডিত্য কিষ্ণিৎ পরিমাণও কমবে না। কোনো প্রেমিকের হৃৎপিন্ড পরিবর্তন করলে তার প্রেমের পরিবর্তন হবে না। এর বিপরীতে মস্তিষ্কে কোনো গড়বড় হলে হাফেজের হিফজ থাকবে না, আলেমের ইলম থাকবে না, পণ্ডিতের পান্ডিত্য লোপ পাবে এবং প্রেমিকের প্রেম হারিয়ে যাবে। স্মৃতিশক্তি, দৃষ্টিশক্তি, শ্রবনশক্তি, বাকশক্তি, ঘ্রাণশক্তি ইত্যাদি বিলুপ্ত হবে।

কেউ বলেন এটা হলো আকল, এটা অনেকটা কাছাকাছি। কিন্তু আমরা জানি জ্ঞান, বিবেক বা বুদ্ধি স্পর্শযোগ্য বস্তু নয়, আকলের কোনো নির্ধারিত আকার নেই, যদিও শরীরের মধ্যে তার নির্দিষ্ট স্থান বা অবস্থান রয়েছে এবং হাদিস শরিফে কলবকে মুদগাহ অর্থাৎ স্পর্শযোগ্য বস্তু বলা হয়েছে; সুতরাং মস্তিষ্ক বা মগজ যেখানে জ্ঞান, বিবেক বা বুদ্ধি থাকে তাকেই কলব বলা শ্রেয়তর হবে।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘বধির, বোবা ও অন্ধ, সুতরাং তারা বিবেচনা করে না।’ (আল কোরআন, সূরা বাকারা : ১৮)। ইমাম ফাররা (রহ.) বলেন, কলব অর্থ আকল আর অবশ্যই কলব বলে মস্তিষ্ককেই বোঝানো হয়। ‘তাদের কলব আছে; কিন্তু তারা তা দ্বারা বোঝে না।’ (সূরা আরাফ : ১৭৯)।
বিখ্যাত মুফাসসির কাজী সানাউল্লাহ পানিপথী (রহ.) ‘কলব’ এর ব্যাখ্যায় লিখেছেন, “কলব এমন একটি অঙ্গ যা বোধ ও জ্ঞান অর্থে ব্যবহৃত হয়। আর ‘কলব’ এর রোগ হলো মূর্খতা, হিংসা, কুফর ও মন্দ ধারণা বা বদ আকিদাহ (ভুল বিশ্বাস)।’’ (তাফসিরে মাজহারি, খণ্ড১, পৃষ্ঠা. ২৩-২৬)।

প্রখ্যাত তাফসিরকারক মাহমুদ আলুসি বাগদাদী (রহ.) ‘কলব’ এর ব্যাখ্যা করেছেন, ‘কলব বলা হয় আল্লাহ প্রদত্ত আলোকিত জ্ঞানী সত্তাকে, যা আল্লাহর নূর অবতরণের স্থল, এর কারণেই মানুষ পদবাচ্য হয়, এ দ্বারাই মানুষ নির্দেশ পালন ও নিষেধ বর্জনে সক্ষম হয়। বহু মুহাক্কিকিন মত দিয়েছেন যে, ‘এই (কলব) অঙ্গটিই হলো জ্ঞানের উৎস, বলা হয়েছে নিশ্চয়ই তা হলো মস্তিষ্কে। আর তাই হলো ঈমানের কেন্দ্রস্থল।’ (তাফসিরে রুহুল মায়ানি, খণ্ড১, পৃষ্ঠা. ২২০-২২১)।

সুবিখ্যাত মুফাসসির শাঈখ ইসমাঈল হাক্কী (রহ.) ‘কলব’ সংক্রান্ত আয়াতের ব্যাখ্যা দিয়েছেন, ‘কলব’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- জ্ঞান শক্তির কেন্দ্রস্থল, যাকে বিবেক বলা হয়, আর ‘কলব’ দ্বারা বোধ ও বিবেক উদ্দেশ্য হয়, যেমন- “নিশ্চয়ই এর মধ্যে তাদের জন্য উপদেশ রয়েছে যাদের ‘কলব’ আছে (অর্থাৎ ‘আকল’ আছে)।’’ (তাফসিরে রুহুল বায়ান, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা. ৪৮)। ইমাম সুয়ুতি (রহ.) ‘কলব’ এর ব্যাখ্যায় লিখেছেন, “যাদের ‘কলব’ আছে অর্থাৎ ‘আকল’ আছে।’’ (তাফসিরে জালালাঈন, প্রথম খণ্ড)। সুতরাং কলব হলো আকল বা আকলের আধার মস্তিষ্ক।

মূলত ‘কলব’ হলো শরীরেরই একটি অঙ্গ, কোরআন, হাদিস ও ফিকহে এর কর্মপরিধি সবিস্তারে আলোচিত হয়েছে, যা দ্বারা বোঝা যায়, কলব হলো শরীরের ওই অঙ্গ যেখানে বুদ্ধি, বিবেক বা জ্ঞান, বোধ, স্মৃতিশক্তি, কল্পনাশক্তি, ইচ্ছাশক্তি, বিশ্লেষণক্ষমতা, মেধাশক্তি, বিচার-বিবেচনা, স্নেহ, করুণা, দয়া-মায়া, প্রেম-ভালোবাসা, আবেগ-আসক্তি, সুখ-দুখ, আনন্দ-বেদনা, রাগ-অনুরাগ, বিরাগ, হিংষা-বিদ্বেষ, ঘৃণা, ভয় ও সাহস থাকে; সর্বোপরি যেখান থেকে সব বিষয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় তারই নাম হলো ‘কলব’ যা সমগ্র মানব সত্তাকে নিয়ন্ত্রণ করে আর তা হলো মস্তিষ্ক।

মুফতি শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী
সৌজন্যে : দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ

-প্রিয়

Post a Comment