বিমুখ সন্তানরা, তাই টলিউড অভিনেত্রীর ঠিকানা ফুটপাত !


ক’দিন আগে ৯০ বছরের বৃদ্ধা মাকে গুন্ডা দিয়ে রাস্তায় বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল ছেলের বিরুদ্ধে৷ সেটা ছিল ভারতের বসিরহাটের ঘটনা৷ এ বার কলকাতাতেই পরিজনদের অবহেলায় ফুটপাতেই আশ্রয় আর এক মায়ের৷ প্রৌঢ়া মায়ের অস্তিত্ব স্বীকারেই রাজি নন ছেলে৷ আর টাকা-পয়সা না-পেলে মেয়ে-জামাইও মায়ের দেখভালে নারাজ৷ বছর পঞ্চান্নর ওই প্রৌঢ়ার নাম মঞ্জু মিশ্র৷ একটা সময় টলিউডের বেশকিছু সিনেমায় পার্শ্বচরিত্রে অভিনয়ও করেছেন তিনি৷ কিন্ত্ত পরিজনদের অবহেলা-গঞ্জনা জুটেছে তাঁরও কপালে৷ দিন কয়েক আগে গুরুতর অবস্থায় ফুতপাতে কাতরাতে দেখে হাসপাতালে ভর্তি করে পুলিশ৷ বর্তমানে শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে চিকিত্‍সাধীন মঞ্জু জানেন না একটু সুস্থ হলে সেই ফুটপাথেই ফিরতে হবে কি না৷ খবর এই সময় ।

গত ১৫ অগস্ট একবালপুরে ফুটপাথে পড়ে পায়ের যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন মঞ্জু৷ এক প্রৌঢ়াকে ওই অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় বাসিন্দারাই লালবাজার কন্ট্রোল রুমে খবর দেন৷ কন্ট্রোলরুমের কাছ থেকে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছন একবালপুর থানার সার্জেন্ট মনীষ পান্ডে-সহ অন্যান্য পুলিশকর্মীরা৷ কিন্ত্ত শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালের চিকিত্‍সক প্রৌঢ়াকে ভর্তির জন্য লিখে দিলেও ছুটির দিন হওয়ায় তাঁকে ওয়ার্ড পর্যন্ত পৌঁছে দিতেই রাজি হচ্ছিলেন না নার্স-ওর্য়াড বয়রা৷ শেষমেষ পুলিশকর্মীরাই তাঁকে ফিমেল সার্জিক্যাল ওয়ার্ডে পৌঁছে দেন৷ কিনে দিয়ে আসেন ওষুধ৷

প্রৌঢ়ার কাছ থেকে ফোন নম্বর নিয়ে পুলিশকর্মীরাই যোগাযোগ করেন তাঁর ছেলে অমিত মিশ্রর সঙ্গে৷ কিন্ত্ত মায়ের হাসপাতালে ভর্তি কথা শুনেও হাসপাতালে আসতে নিমরাজি ছিল অমিত৷ পুলিশের ধমকে সেদিন হাসপাতালে এলেও তারপর থেকে দেখা মেলেনি তাঁর৷ হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে কাঁদতে কাঁদতে মঞ্জু বলছিলেন, ‘তিনদিন হল ছেলে আসছে না৷ ওষুধও ফুরিয়ে গিয়েছে৷ খোঁজ নেয়নি মেয়ে-জামাইও৷’ তাঁর আক্ষেপ, ‘স্বার্থের সঙ্গেই সবার সর্ম্পক৷ সম্পত্তি দিলে হয়তো মেয়ে-জামাই দেখতে আসত, দেখভাল করত৷’কে এই মঞ্জু মিশ্র?

প্রসেনজিত্‍ চট্টোপাধ্যায়, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় অভিনীত ‘এক পশলা বৃষ্টি’ ছবিতে পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন মঞ্জু৷ উল্লেখযোগ্য কোনও ভূমিকায় অভিনয় না করলেও কাজ করেছেন সন্ধ্যা রায়-বসন্ত চৌধুরি অভিনীত ‘সত্যমিথ্যা’, রূপা গঙ্গোপাধ্যায় অভিনীত ‘ধর্মযুদ্ধ’-সহ বেশ কয়েকটি বাংলা ছবিতে৷ এছাড়াও বলিউড অভিনেত্রী জুহি চাওলা- নাগমা অভিনীত একটি হিন্দি ছবিতেও কাজ করেছেন বলে জানিয়েছেন মঞ্জু৷ একবালপুরে দোতলা বাড়িও ছিল প্রৌঢ়ার৷

মঞ্জু জানান, তাঁর এক মেয়ে থাকেন দিল্লিতে, অন্যজন থাকেন মুকুন্দপুর এলাকায়৷ একমাত্র ছেলে ভাড়া থাকেন একবালপুরেরই অন্য একটি বাড়িতে৷ ফলে গত কয়েক মাস ধরে একবালপুরের বিদ্যাভবন স্কুল সংলগ্ন ফুটপাথই ঠিকানা হয়েছে মঞ্জুর৷

কীভাবে এমনই করুণ পরিস্থির শিকার হলেন মঞ্জুর? তাঁর দাবি, অনেক বছর আগেই তাঁর সঙ্গে সর্ম্পক চুকিয়েছেন স্বামী৷ ছোট তিন সন্তানকে একবালপুরে মায়ের বাড়িতে থেকেই মানুষ করেন তিনি৷ তবে কলকাতায় পরের দিকে সেভাবে কাজ না মেলায় কয়েকবছর মুম্বইতেও ছিলেন মঞ্জু৷ সেখানেও সাড়া পাননি তেমন৷ ছেলে-মেয়েদের মানুষ করতে পানশালাতে গানও গেয়েছেন একসময়৷ তাঁর অভিযোগ, ‘মায়ের সম্মতিতেই একবালপুরে বাড়ি বিক্রি করা সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা৷ কিন্ত্ত বাড়ি বিক্রির জন্য যার উপর ভরসা করেছিলাম, পথে বসিয়েছে সে-ই৷ বাড়ির বিক্রির ১৬ লক্ষ টাকার তেমনই কিছুই হাতে পাইনি৷’
কিন্ত্ত কি বলছেন তাঁর পরিজনেরা?

তাঁরা যা বলছেন, তা শুনলে অবশ্য সর্বস্ব খুইয়ে ছেলেমেয়েকে মানুষ করা বাবা-মায়েদের আঁতকে ওঠার যথেষ্ট কারণ আছে৷ ছেলে অমিতের পাল্টা প্রশ্ন, ‘আমি কেন দেখবো? উনি আমার মা-ই নন৷ বেহিসেবি জীবন-যাপন করে বাড়ির বিক্রির টাকা উড়িয়েছেন৷ আমার নিজেরই চলে না৷ ওঁকে কী করে দেখবো?’ ছেলের মুখে এমন কথা শুনেও তাঁর বদনাম শুনতে নারাজ অমিতের মা মঞ্জু৷ তাঁর কথায়, ‘ছেলে অভিমানে ওইসব বলছে৷ সত্যি ওর আর্থিক অবস্থা ভালো নয়৷ তাই হয়তো আমার দেখভাল করতে পারে না৷’ আর মেয়ে? মুকুন্দপুকুরে বাসিন্দা মঞ্জুর এক মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলে ফোন ধরেন তাঁর জামাই মনোজ পোদ্দার৷
তিনি জানিয়ে দেন, গত কয়েক বছর ধরে তাঁদের সঙ্গে সর্ম্পক নেই শ্বাশুড়ির৷ অসুস্থ একাকী প্রৌঢ়াকে কেন দেখভাল করেন না প্রশ্ন করা হলে, কার্যত ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন মনোজ৷ তাঁর প্রশ্ন,’আমরা কেন দেখবো? আমাদের কি সম্পত্তি দিয়েছে? ওঁর ছেলে আছেন৷ তিনি দেখবেন৷’ মনোজের কথাতেই স্পষ্ট, সম্পত্তি পেলে হয়তো মঞ্জুর দায়িত্ব নিতেন মেয়ে-জামাই৷ তাঁর দিল্লি নিবাসী মেয়ের সঙ্গে অবশ্য যোগাযোগ করা যায়নি৷

হাসপাতালে ভর্তির সময় রোগীকে নিয়ে যেভাবে বিপত্তির শিকার হন পুলিশকর্মীরা, তাতে হাসপাতালের এক শ্রেণীর কর্মীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল৷ এ নিয়ে হাসপাতাল সুপার সৌমাভ দত্তের প্রতিক্রিয়া, ‘এগুলি অপ্রত্যাশিত৷ আমি খোঁজ নিয়ে দেখবো সেদিন কারা ডিউতে ছিলেন৷’ সেই সঙ্গে তিনি জানান, কোন রোগীর চিকিত্‍সায় ওষুধের সমস্যা হওয়ার কথা নয়৷ এক্ষেত্রে এমন কোনও ঘটনা হলে তাও খোঁজ নিয়ে দেখবো৷
হাসপাতাল তো সাময়িক ঠিকানা৷ কিন্ত্ত সুস্থ হলে কি সেই ফুটপাথই ভবিষ্যত্‍ মঞ্জুর?


-লেটেস্টবিডিনিউজ

Post a Comment